ড. মো. শামছুল আলম

জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের সভাপতি পদে নির্বাচিত হয়েছেন বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান। প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ নির্বাচনে তিনি সাইপ্রাসের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর বিশেষ দূত আন্দ্রেয়াস এস কাকোরিসকে পরাজিত করে এক বছরের জন্য এই মর্যাদাপূর্ণ দায়িত্ব লাভ করেছেন। এ নির্বাচনের মাধ্যমে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সভাপতির আসনে দ্বিতীয়বারের মতো অধিষ্ঠিত হতে যাচ্ছে বাংলাদেশের প্রতিনিধি।
এর আগে ১৯৮৬ সালে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৪১তম অধিবেশনের সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন বাংলাদেশের বিশিষ্ট কূটনীতিক ও সাবেক পররাষ্ট্রসচিব হুমায়ুন রশিদ চৌধুরী। প্রায় চার দশক পর পুনরায় এই পদে বাংলাদেশের প্রতিনিধির নির্বাচিত হওয়ার ঘটনা শুধু একটি কূটনৈতিক সাফল্য নয়, বরং বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশের ক্রমবর্ধমান মর্যাদা ও প্রভাবের একটি উজ্জ্বল স্বীকৃতি। এই বিজয়ের মধ্য দিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের গ্রহণযোগ্যতা, কূটনৈতিক সক্ষমতা এবং বহুপাক্ষিক নেতৃত্বের প্রতি বিশ্বসমাজের আস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিফলন ঘটেছে।
বর্তমান বিশ্ব নানামুখী সংকটে জর্জরিত। বিশ্বব্যবস্থা এক গভীর রূপান্তরের মধ্য দিয়ে অতিক্রম করছে। ইউক্রেন যুদ্ধ, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত, জলবায়ু পরিবর্তনের ক্রমবর্ধমান ঝুঁকি, অভিবাসন সংকট, খাদ্য ও জ্বালানি নিরাপত্তার চ্যালেঞ্জ, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার বিস্তার এবং নতুন ভূরাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা আন্তর্জাতিক রাজনীতিকে নতুনভাবে বিন্যস্ত করছে। এমন পরিস্থিতির মধ্যে বিশ্বের প্রতিটি দেশের প্রতিনিধিদের নিয়ে গঠিত সাধারণ পরিষদের সভাপতিত্ব নিছক কোন ছোটখাটো অর্জন নয়। একটি উন্নয়নশীল দেশের প্রতিনিধি হিসেবে বাংলাদেশের এই অবস্থানে পৌঁছানো শুধু কূটনৈতিক দক্ষতার নয়, বরং রাষ্ট্রীয় সক্ষমতারও স্বীকৃতি। বাংলাদেশ সরকারের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকারের প্রতি বিশ্ব নেতৃত্বের যেই আস্থা, তা ফুটে উঠেছে এই অর্জনের মাধ্যমে।
বলা বাহুল্য, বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর অন্যতম চ্যালেঞ্জ ছিল কূটনৈতিক অবস্থান নিশ্চিত করা। শেখ মুজিবুর রহমানের ভারতঘেঁষা পররাষ্ট্রনীতির কারণে বাংলাদেশ বিশ্বরাজনীতিতে ভাল অবস্থানে পৌঁছাতে পারেনি। কিন্তু ভৌগোলিক অবস্থান, জনসংখ্যা, উন্নয়ন সম্ভাবনা এবং আঞ্চলিক বাস্তবতা বিবেচনায় বাংলাদেশ সব সময়ই একটি ভারসাম্যপূর্ণ পররাষ্ট্রনীতির প্রয়োজন অনুভব করেছে।
এই ধারার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ স্থপতি ছিলেন শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান। রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের পর তিনি বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতিকে একটি বাস্তববাদী ভিত্তির ওপর দাঁড় করানোর চেষ্টা করেন। তাঁর রাষ্ট্রচিন্তার অন্যতম বৈশিষ্ট্য ছিল জাতীয় স্বার্থকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের জন্য একটি স্বতন্ত্র অবস্থান তৈরি করা।
রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের সময়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে দেশটির সবচেয়ে বড় শক্তি ছিল তার বহুমাত্রিক কূটনীতি। তাঁর হাত ধরেই বাংলাদেশ মুসলিম বিশ্ব, পশ্চিমা রাষ্ট্রসমূহ, চীন এবং আঞ্চলিক শক্তিগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক সম্প্রসারণের উদ্যোগ নেয়। তিনি বিশ্বাস করতেন, একটি ছোট রাষ্ট্রের জন্য কূটনৈতিক বিচক্ষণতাই সবচেয়ে বড় শক্তি। “সকলের সঙ্গে বন্ধুত্ব, কারও সঙ্গে বৈরিতা নয়” নীতির বাস্তব প্রয়োগের মধ্য দিয়ে জিয়াউর রহমানের হাত ধরে বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে একটি গ্রহণযোগ্য অবস্থান গড়ে তোলে। আজকের বাংলাদেশের বহু কূটনৈতিক অর্জনের পেছনে সেই ভিত্তি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে।
বর্তমান সময়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকারের পররাষ্ট্রনীতি নিয়ে বিভিন্ন মহলে নানা মূল্যায়ন রয়েছে। বাংলাদেশকে নতুন আঙ্গিকে গড়তে সরকার জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বহুমুখী পদক্ষেপ নিয়েছে। সরকার অর্থনৈতিক কূটনীতি, উন্নয়ন সহযোগিতা, আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ আকর্ষণ, বহুপাক্ষিক সম্পৃক্ততা এবং বৈশ্বিক ফোরামগুলোতে সক্রিয় অংশগ্রহণের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছে। দক্ষিণ এশিয়া, মধ্যপ্রাচ্য, ইউরোপ, উত্তর আমেরিকা এবং পূর্ব এশিয়ার বিভিন্ন দেশের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদারের প্রচেষ্টা বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অবস্থানকে শক্তিশালী করতে সহায়তা করেছে বলে অনেকে মনে করেন।
বস্তুত, আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে কোনো রাষ্ট্রের সাফল্য রাতারাতি অর্জিত হয় না। এর পেছনে থাকে দীর্ঘমেয়াদি যোগাযোগ, আস্থা তৈরি, দক্ষ প্রতিনিধিত্ব এবং ধারাবাহিক নীতিগত অবস্থান। জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সভাপতির পদে নির্বাচিত হওয়ার ক্ষেত্রেও একই বিষয় প্রযোজ্য। জাতিসংঘের ১৯৩টি সদস্য রাষ্ট্রের মধ্যে সংখ্যাগরিষ্ঠ সমর্থন অর্জন করা কোনো সাধারণ ঘটনা নয়। এটি প্রমাণ করে যে, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে বাংলাদেশকে একটি দায়িত্বশীল, সংলাপমুখী এবং সহযোগিতাপূর্ণ রাষ্ট্র হিসেবে দেখা হচ্ছে। পাশাপাশি, এই অর্জনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, এটি বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তিকে নতুন মাত্রা দিয়েছে। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে বাংলাদেশ এখন আর কেবল সাহায্যনির্ভর রাষ্ট্র নয়, বরং বহু বৈশ্বিক ইস্যুতে অভিজ্ঞতা ও নেতৃত্ব দেওয়ার সক্ষমতা অর্জনকারী একটি দেশ।
এখন প্রশ্ন হলো, জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সভাপতির পদ বাংলাদেশকে কিভাবে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাবে? বস্তুত, এই পদ সরাসরি কোনো নির্বাহী ক্ষমতা প্রদান না করলেও আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকার সুযোগ সৃষ্টি করে। সাধারণ পরিষদের কার্যক্রম পরিচালনা, বিভিন্ন রাষ্ট্রের মধ্যে সংলাপ উৎসাহিত করা এবং গুরুত্বপূর্ণ বৈশ্বিক ইস্যুগুলোকে অগ্রাধিকার দেওয়ার ক্ষেত্রে সভাপতির ভূমিকা অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। বাংলাদেশের জন্য এর বাস্তব সুবিধাও রয়েছে। জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতিগ্রস্ত দেশ হিসেবে বাংলাদেশের দাবি ও প্রত্যাশা আরও জোরালোভাবে তুলে ধরার সুযোগ সৃষ্টি হবে।
আবার, রোহিঙ্গা সংকটের মতো মানবিক ইস্যুতে আন্তর্জাতিক মনোযোগ ধরে রাখা সহজ হবে। পাশাপাশি টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা বাস্তবায়ন, উন্নয়ন অর্থায়ন এবং প্রযুক্তিগত সহযোগিতার মতো ক্ষেত্রে নতুন অংশীদারিত্ব গড়ে তোলার সুযোগ বাড়বে। এছাড়াও বিদেশি বিনিয়োগ এবং আন্তর্জাতিক আস্থার ক্ষেত্রেও ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, বিশ্বরাজনীতির বর্তমান বাস্তবতায় সফট পাওয়ারের গুরুত্ব ক্রমশ বাড়ছে। সামরিক শক্তি বা অর্থনৈতিক সক্ষমতার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতা, নৈতিক অবস্থান এবং কূটনৈতিক নেতৃত্ব এখন রাষ্ট্রের প্রভাব নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এক্ষেত্রেও বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক সহযোগিতা ও বিনিয়োগ বৃদ্ধিতে সুযোগ পাবে।
এই সাফল্যের রাজনৈতিক তাৎপর্যও কম নয়। একটি রাষ্ট্র যখন আন্তর্জাতিক অঙ্গনে স্বীকৃতি অর্জন করে, তখন তা দেশের অভ্যন্তরীণ আত্মবিশ্বাস বৃদ্ধি করে এবং সরকারের নীতিগত অবস্থানকে শক্তিশালী করে। বিশ্লেষকদের মতে, এই নির্বাচন বর্তমান সরকারের কূটনৈতিক কার্যক্রমের প্রতি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গির ইঙ্গিত বহন করে। ফলে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির গ্রহণযোগ্যতা আরও বৃদ্ধি পেয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে।
তবে এই অর্জনের প্রকৃত মূল্যায়ন হবে ভবিষ্যতের কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে। কেবল একটি মর্যাদাপূর্ণ পদ লাভ করাই যথেষ্ট নয়, বরং সেই অবস্থানকে দেশের দীর্ঘমেয়াদি স্বার্থে কতটা কার্যকরভাবে ব্যবহার করা যায় সেটিই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। জলবায়ু ন্যায়বিচার, উন্নয়ন অর্থায়ন, গ্লোবাল সাউথের স্বার্থরক্ষা, শান্তিরক্ষা কার্যক্রম এবং মানবিক সংকট মোকাবিলার মতো ইস্যুতে বাংলাদেশ যদি আরও সক্রিয় ও প্রভাবশালী ভূমিকা পালন করতে পারে, তাহলে এই অর্জনের তাৎপর্য বহুগুণে বৃদ্ধি পাবে।
নিঃসন্দেহে, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে বাংলাদেশ অল্প সময়ের মধ্যেই আন্তর্জাতিক অঙ্গনে এক নতুন আত্মবিশ্বাস ও গতিশীলতার পরিচয় দিয়েছে। বহুপাক্ষিক কূটনীতি, আঞ্চলিক সহযোগিতা এবং বৈশ্বিক সম্পৃক্ততার ক্ষেত্রে বাংলাদেশের ক্রমবর্ধমান উপস্থিতি আজ বিশ্বসমাজের কাছে আরও দৃশ্যমান হয়ে উঠেছে। আমরা বিশ্বাস করি, এই অর্জন বিশ্বরাজনীতিতে বাংলাদেশের দৃশ্যমান উত্থানের এক উজ্জ্বল মাইলফলক হিসেবে ইতিহাসে স্থান করে নেবে। আগামী দিনে দূরদর্শী কূটনীতি, জাতীয় স্বার্থভিত্তিক পররাষ্ট্রনীতি এবং কার্যকর আন্তর্জাতিক নেতৃত্বের মাধ্যমে এই সুযোগকে যথাযথভাবে কাজে লাগানো গেলে বাংলাদেশ কেবল বৈশ্বিক আলোচনার অংশগ্রহণকারী হিসেবেই নয়, বরং আন্তর্জাতিক নীতি নির্ধারণ ও মতামত গঠনের ক্ষেত্রে একটি প্রভাবশালী কণ্ঠস্বর হিসেবে নিজেকে আরও সুদৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত করতে সক্ষম হবে।
ড. মো. শামছুল আলম: জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সরকার ও রাজনীতি বিভাগের অধ্যাপক এবং সমাজবিজ্ঞান অনুষদের ডিন।

জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের সভাপতি পদে নির্বাচিত হয়েছেন বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান। প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ নির্বাচনে তিনি সাইপ্রাসের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর বিশেষ দূত আন্দ্রেয়াস এস কাকোরিসকে পরাজিত করে এক বছরের জন্য এই মর্যাদাপূর্ণ দায়িত্ব লাভ করেছেন। এ নির্বাচনের মাধ্যমে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সভাপতির আসনে দ্বিতীয়বারের মতো অধিষ্ঠিত হতে যাচ্ছে বাংলাদেশের প্রতিনিধি।
এর আগে ১৯৮৬ সালে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৪১তম অধিবেশনের সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন বাংলাদেশের বিশিষ্ট কূটনীতিক ও সাবেক পররাষ্ট্রসচিব হুমায়ুন রশিদ চৌধুরী। প্রায় চার দশক পর পুনরায় এই পদে বাংলাদেশের প্রতিনিধির নির্বাচিত হওয়ার ঘটনা শুধু একটি কূটনৈতিক সাফল্য নয়, বরং বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশের ক্রমবর্ধমান মর্যাদা ও প্রভাবের একটি উজ্জ্বল স্বীকৃতি। এই বিজয়ের মধ্য দিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের গ্রহণযোগ্যতা, কূটনৈতিক সক্ষমতা এবং বহুপাক্ষিক নেতৃত্বের প্রতি বিশ্বসমাজের আস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিফলন ঘটেছে।
বর্তমান বিশ্ব নানামুখী সংকটে জর্জরিত। বিশ্বব্যবস্থা এক গভীর রূপান্তরের মধ্য দিয়ে অতিক্রম করছে। ইউক্রেন যুদ্ধ, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত, জলবায়ু পরিবর্তনের ক্রমবর্ধমান ঝুঁকি, অভিবাসন সংকট, খাদ্য ও জ্বালানি নিরাপত্তার চ্যালেঞ্জ, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার বিস্তার এবং নতুন ভূরাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা আন্তর্জাতিক রাজনীতিকে নতুনভাবে বিন্যস্ত করছে। এমন পরিস্থিতির মধ্যে বিশ্বের প্রতিটি দেশের প্রতিনিধিদের নিয়ে গঠিত সাধারণ পরিষদের সভাপতিত্ব নিছক কোন ছোটখাটো অর্জন নয়। একটি উন্নয়নশীল দেশের প্রতিনিধি হিসেবে বাংলাদেশের এই অবস্থানে পৌঁছানো শুধু কূটনৈতিক দক্ষতার নয়, বরং রাষ্ট্রীয় সক্ষমতারও স্বীকৃতি। বাংলাদেশ সরকারের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকারের প্রতি বিশ্ব নেতৃত্বের যেই আস্থা, তা ফুটে উঠেছে এই অর্জনের মাধ্যমে।
বলা বাহুল্য, বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর অন্যতম চ্যালেঞ্জ ছিল কূটনৈতিক অবস্থান নিশ্চিত করা। শেখ মুজিবুর রহমানের ভারতঘেঁষা পররাষ্ট্রনীতির কারণে বাংলাদেশ বিশ্বরাজনীতিতে ভাল অবস্থানে পৌঁছাতে পারেনি। কিন্তু ভৌগোলিক অবস্থান, জনসংখ্যা, উন্নয়ন সম্ভাবনা এবং আঞ্চলিক বাস্তবতা বিবেচনায় বাংলাদেশ সব সময়ই একটি ভারসাম্যপূর্ণ পররাষ্ট্রনীতির প্রয়োজন অনুভব করেছে।
এই ধারার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ স্থপতি ছিলেন শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান। রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের পর তিনি বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতিকে একটি বাস্তববাদী ভিত্তির ওপর দাঁড় করানোর চেষ্টা করেন। তাঁর রাষ্ট্রচিন্তার অন্যতম বৈশিষ্ট্য ছিল জাতীয় স্বার্থকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের জন্য একটি স্বতন্ত্র অবস্থান তৈরি করা।
রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের সময়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে দেশটির সবচেয়ে বড় শক্তি ছিল তার বহুমাত্রিক কূটনীতি। তাঁর হাত ধরেই বাংলাদেশ মুসলিম বিশ্ব, পশ্চিমা রাষ্ট্রসমূহ, চীন এবং আঞ্চলিক শক্তিগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক সম্প্রসারণের উদ্যোগ নেয়। তিনি বিশ্বাস করতেন, একটি ছোট রাষ্ট্রের জন্য কূটনৈতিক বিচক্ষণতাই সবচেয়ে বড় শক্তি। “সকলের সঙ্গে বন্ধুত্ব, কারও সঙ্গে বৈরিতা নয়” নীতির বাস্তব প্রয়োগের মধ্য দিয়ে জিয়াউর রহমানের হাত ধরে বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে একটি গ্রহণযোগ্য অবস্থান গড়ে তোলে। আজকের বাংলাদেশের বহু কূটনৈতিক অর্জনের পেছনে সেই ভিত্তি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে।
বর্তমান সময়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকারের পররাষ্ট্রনীতি নিয়ে বিভিন্ন মহলে নানা মূল্যায়ন রয়েছে। বাংলাদেশকে নতুন আঙ্গিকে গড়তে সরকার জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বহুমুখী পদক্ষেপ নিয়েছে। সরকার অর্থনৈতিক কূটনীতি, উন্নয়ন সহযোগিতা, আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ আকর্ষণ, বহুপাক্ষিক সম্পৃক্ততা এবং বৈশ্বিক ফোরামগুলোতে সক্রিয় অংশগ্রহণের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছে। দক্ষিণ এশিয়া, মধ্যপ্রাচ্য, ইউরোপ, উত্তর আমেরিকা এবং পূর্ব এশিয়ার বিভিন্ন দেশের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদারের প্রচেষ্টা বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অবস্থানকে শক্তিশালী করতে সহায়তা করেছে বলে অনেকে মনে করেন।
বস্তুত, আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে কোনো রাষ্ট্রের সাফল্য রাতারাতি অর্জিত হয় না। এর পেছনে থাকে দীর্ঘমেয়াদি যোগাযোগ, আস্থা তৈরি, দক্ষ প্রতিনিধিত্ব এবং ধারাবাহিক নীতিগত অবস্থান। জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সভাপতির পদে নির্বাচিত হওয়ার ক্ষেত্রেও একই বিষয় প্রযোজ্য। জাতিসংঘের ১৯৩টি সদস্য রাষ্ট্রের মধ্যে সংখ্যাগরিষ্ঠ সমর্থন অর্জন করা কোনো সাধারণ ঘটনা নয়। এটি প্রমাণ করে যে, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে বাংলাদেশকে একটি দায়িত্বশীল, সংলাপমুখী এবং সহযোগিতাপূর্ণ রাষ্ট্র হিসেবে দেখা হচ্ছে। পাশাপাশি, এই অর্জনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, এটি বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তিকে নতুন মাত্রা দিয়েছে। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে বাংলাদেশ এখন আর কেবল সাহায্যনির্ভর রাষ্ট্র নয়, বরং বহু বৈশ্বিক ইস্যুতে অভিজ্ঞতা ও নেতৃত্ব দেওয়ার সক্ষমতা অর্জনকারী একটি দেশ।
এখন প্রশ্ন হলো, জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সভাপতির পদ বাংলাদেশকে কিভাবে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাবে? বস্তুত, এই পদ সরাসরি কোনো নির্বাহী ক্ষমতা প্রদান না করলেও আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকার সুযোগ সৃষ্টি করে। সাধারণ পরিষদের কার্যক্রম পরিচালনা, বিভিন্ন রাষ্ট্রের মধ্যে সংলাপ উৎসাহিত করা এবং গুরুত্বপূর্ণ বৈশ্বিক ইস্যুগুলোকে অগ্রাধিকার দেওয়ার ক্ষেত্রে সভাপতির ভূমিকা অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। বাংলাদেশের জন্য এর বাস্তব সুবিধাও রয়েছে। জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতিগ্রস্ত দেশ হিসেবে বাংলাদেশের দাবি ও প্রত্যাশা আরও জোরালোভাবে তুলে ধরার সুযোগ সৃষ্টি হবে।
আবার, রোহিঙ্গা সংকটের মতো মানবিক ইস্যুতে আন্তর্জাতিক মনোযোগ ধরে রাখা সহজ হবে। পাশাপাশি টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা বাস্তবায়ন, উন্নয়ন অর্থায়ন এবং প্রযুক্তিগত সহযোগিতার মতো ক্ষেত্রে নতুন অংশীদারিত্ব গড়ে তোলার সুযোগ বাড়বে। এছাড়াও বিদেশি বিনিয়োগ এবং আন্তর্জাতিক আস্থার ক্ষেত্রেও ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, বিশ্বরাজনীতির বর্তমান বাস্তবতায় সফট পাওয়ারের গুরুত্ব ক্রমশ বাড়ছে। সামরিক শক্তি বা অর্থনৈতিক সক্ষমতার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতা, নৈতিক অবস্থান এবং কূটনৈতিক নেতৃত্ব এখন রাষ্ট্রের প্রভাব নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এক্ষেত্রেও বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক সহযোগিতা ও বিনিয়োগ বৃদ্ধিতে সুযোগ পাবে।
এই সাফল্যের রাজনৈতিক তাৎপর্যও কম নয়। একটি রাষ্ট্র যখন আন্তর্জাতিক অঙ্গনে স্বীকৃতি অর্জন করে, তখন তা দেশের অভ্যন্তরীণ আত্মবিশ্বাস বৃদ্ধি করে এবং সরকারের নীতিগত অবস্থানকে শক্তিশালী করে। বিশ্লেষকদের মতে, এই নির্বাচন বর্তমান সরকারের কূটনৈতিক কার্যক্রমের প্রতি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গির ইঙ্গিত বহন করে। ফলে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির গ্রহণযোগ্যতা আরও বৃদ্ধি পেয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে।
তবে এই অর্জনের প্রকৃত মূল্যায়ন হবে ভবিষ্যতের কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে। কেবল একটি মর্যাদাপূর্ণ পদ লাভ করাই যথেষ্ট নয়, বরং সেই অবস্থানকে দেশের দীর্ঘমেয়াদি স্বার্থে কতটা কার্যকরভাবে ব্যবহার করা যায় সেটিই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। জলবায়ু ন্যায়বিচার, উন্নয়ন অর্থায়ন, গ্লোবাল সাউথের স্বার্থরক্ষা, শান্তিরক্ষা কার্যক্রম এবং মানবিক সংকট মোকাবিলার মতো ইস্যুতে বাংলাদেশ যদি আরও সক্রিয় ও প্রভাবশালী ভূমিকা পালন করতে পারে, তাহলে এই অর্জনের তাৎপর্য বহুগুণে বৃদ্ধি পাবে।
নিঃসন্দেহে, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে বাংলাদেশ অল্প সময়ের মধ্যেই আন্তর্জাতিক অঙ্গনে এক নতুন আত্মবিশ্বাস ও গতিশীলতার পরিচয় দিয়েছে। বহুপাক্ষিক কূটনীতি, আঞ্চলিক সহযোগিতা এবং বৈশ্বিক সম্পৃক্ততার ক্ষেত্রে বাংলাদেশের ক্রমবর্ধমান উপস্থিতি আজ বিশ্বসমাজের কাছে আরও দৃশ্যমান হয়ে উঠেছে। আমরা বিশ্বাস করি, এই অর্জন বিশ্বরাজনীতিতে বাংলাদেশের দৃশ্যমান উত্থানের এক উজ্জ্বল মাইলফলক হিসেবে ইতিহাসে স্থান করে নেবে। আগামী দিনে দূরদর্শী কূটনীতি, জাতীয় স্বার্থভিত্তিক পররাষ্ট্রনীতি এবং কার্যকর আন্তর্জাতিক নেতৃত্বের মাধ্যমে এই সুযোগকে যথাযথভাবে কাজে লাগানো গেলে বাংলাদেশ কেবল বৈশ্বিক আলোচনার অংশগ্রহণকারী হিসেবেই নয়, বরং আন্তর্জাতিক নীতি নির্ধারণ ও মতামত গঠনের ক্ষেত্রে একটি প্রভাবশালী কণ্ঠস্বর হিসেবে নিজেকে আরও সুদৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত করতে সক্ষম হবে।
ড. মো. শামছুল আলম: জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সরকার ও রাজনীতি বিভাগের অধ্যাপক এবং সমাজবিজ্ঞান অনুষদের ডিন।

আধুনিক জাতিরাষ্ট্রে সীমান্ত একটি গুরুত্বপূর্ণ ফ্যাক্টর হিসেবে বিবেচিত হয়। সীমানার মধ্য দিয়ে দুটি রাষ্ট্রের সীমানাই কেবল নির্ধারিত হয় না, বরং রাষ্ট্রের নাগরিকদের অবাধ চলাচলের সীমারেখা ও নিয়ন্ত্রণের যৌক্তিকতাও নির্ধারিত হয়।
১৬ ঘণ্টা আগে
কীটনাশক উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান ভ্যালেন্ট বায়োসায়েন্স এলএলসির অর্থায়নে মশা মারা শিখতে যুক্তরাষ্ট্র যেতে চেয়েছিলেন চট্টগ্রাম সিটি কোরপোরেশনের (চসিক) মেয়র ও অন্যরা।
১৮ ঘণ্টা আগে
বিশ্ব পরিবেশ দিবসে জাতিসংঘের পরিবেশ কর্মসূচি এবার থিম নির্ধারণ করেছে– ‘প্রকৃতি থেকে অনুপ্রেরণায়। জলবায়ুর জন্য। আমাদের ভবিষ্যতের জন্য।’ সংস্থাটি স্পষ্টভাবে বলেছে, গত ১১ বছর ছিল ইতিহাসে উষ্ণতম।
১৯ ঘণ্টা আগে
আজ ৫ জুন, বিশ্ব পরিবেশ দিবস। বিশ্বমঞ্চে এবারের সতর্কবার্তা হলো— ‘#NowForClimate’ বা ‘জলবায়ু নিয়ে ভাবার এখনই সময়’। এটি এখন আর ভবিষ্যতের কোনো তাত্ত্বিক বিতর্ক নয়, বরং বর্তমানের অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই। বৈশ্বিক তাপমাত্রা ১ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের বিপজ্জনক সীমানা ছাড়িয়ে যাওয়ার পথে। বাংলাদেশের মতো বদ্বীপে
২১ ঘণ্টা আগে