সম্পাদকীয়

মব জাস্টিস থেকে মব সেন্সরশিপ: রাষ্ট্র কি পিছু হটছে

প্রকাশ : ০৪ জুন ২০২৬, ১৭: ৩৬
সম্পাদকীয় প্রতীকী ছবি। স্ট্রিম গ্রাফিক

জুলাই ২০২৪-এর গণঅভ্যুত্থানের পর বাংলাদেশে ‘মব’ বা জনরোষের নতুন এক বাস্তবতার জন্ম হয়েছে। প্রথম পর্যায়ে মবের প্রধান চালিকাশক্তি ছিল প্রতিশোধ, ক্রোধ ও ক্ষমতার পুনর্বিন্যাস। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে মবের এই চরিত্র পরিবর্তিত হয়েছে। এখন মব সমাজের ওপর এক ধরনের অনানুষ্ঠানিক কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করছে। মবের এই বিবর্তনের দুটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে মিরপুরের শাহ আলী মাজারে হামলা এবং ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় ‘বনলতা এক্সপ্রেস’ চলচ্চিত্রের প্রদর্শনী বন্ধের ঘটনাকে দেখা যেতে পারে। শাহ আলী মাজারে হামলা ছিল একটি ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির ওপর সরাসরি আক্রমণ। অন্যদিকে, বনলতা এক্সপ্রেসের প্রদর্শনী বন্ধে কোনো লাঠি বা ভাঙচুর ছিল না। ছিল কেবল প্রবল চাপ। প্রশাসনের হস্তক্ষেপে আইনত বৈধ একটি আয়োজন শেষ পর্যন্ত স্থগিত হয়ে গেল।

এখানেই মবের নতুন কৌশল স্পষ্ট হয়। আগে মবের কাজ ছিল ভাঙচুর বা হামলা করা। এখন মবের কাজ হলো সিদ্ধান্ত বদলে দেওয়া বা ‘ভেটো’ দেওয়া। এখন মবকে সব সময় লাঠি ব্যবহার করতে হয় না, সম্ভাব্য অশান্তির হুমকিই যথেষ্ট হয়ে দাঁড়ায়। যে পক্ষ সবচেয়ে জোরে হুমকি দিতে পারে, তারাই অন্যের অধিকার সীমিত করতে সক্ষম হয়। ধর্মীয়, সাংস্কৃতিক বা সামাজিক যেকোনো বিষয়ে সংগঠিত গোষ্ঠী আপত্তি তুললেই প্রশাসন অনেক ক্ষেত্রে ‘আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি’র যুক্তিতে পিছিয়ে যাচ্ছে। প্রশাসনিক দৃষ্টিকোণ থেকে এটি একটি সহজ সমাধান। ৫০০ জন প্রতিবাদকারী সামলানোর চেয়ে একটি অনুষ্ঠান বন্ধ করা সহজ।

কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে এই কৌশল অত্যন্ত ক্ষতিকর। যখনই প্রশাসন সংঘর্ষ এড়াতে অনুষ্ঠান বন্ধ করে দেয়, তখনই প্রতিবাদী মবের কৌশল সফল হয়ে যায়। এটি সমাজকে সংকেত দেয় যে সংগঠিত হলে অন্যের ধর্মীয় বা সাংস্কৃতিক চর্চায় হস্তক্ষেপ করা সম্ভব। একটি গোষ্ঠী সফল হলে অন্য গোষ্ঠীগুলোও একই পথ অনুসরণ করে। শেষ পর্যন্ত ‘সেলফ-সেন্সরশিপ’ বাড়িয়ে তোলে। বর্তমানে শান্তিপূর্ণ পক্ষের চেয়ে চাপ সৃষ্টিকারী পক্ষকেই পুরস্কৃত করা হচ্ছে। সহিংসতার আশঙ্কা তৈরি করলেই সিদ্ধান্ত বদলানো সম্ভব—এই ধারণাটি সংঘর্ষ-সৃষ্টিকারীদের জন্য একটি শক্তিশালী প্রণোদনা হিসেবে কাজ করছে। এই প্রবণতা চলতে থাকলে ক্ষতিগ্রস্ত হবে আইনের শাসনের মূল ধারণাটি। যে সমাজে আইনের বদলে সংগঠিত চাপ সিদ্ধান্ত নির্ধারণ করে, সেখানে মব আর ব্যতিক্রম থাকে না। মব ধীরে ধীরে নিয়মে পরিণত হয়।

নতুন নির্বাচিত সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর ‘মব কালচার’ বরদাশত করা হবে না বলে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। শেখ হাসিনার পতনের পর মানুষের মধ্যে আত্মবিশ্বাস তৈরি হয়েছে যে তারা সংঘবদ্ধ হয়ে যেকোনো কিছু রুখে দিতে পারে। এই ধারণা মোকাবিলাই এখন সরকারের বড় পরীক্ষা।

একটি নির্বাচিত সরকারের মব সহিংসতা মোকাবিলার ক্ষেত্রে ভালো অবস্থানে থাকার কথা। তবে তাদের এই গণতান্ত্রিক ম্যান্ডেটকে পুলিশ বাহিনীর ওপর কার্যকর নিয়ন্ত্রণে রূপান্তর করতে হবে। এ ক্ষেত্রে সরকার পুলিশকে রাজনৈতিক কর্তৃত্ব ব্যবহার করে স্পষ্ট নির্দেশনা দিতে হবে। পুলিশের বিশ্বাসযোগ্যতা পুনর্গঠন করতে হবে, চেইন অব কমান্ড জোরদার করতে হবে এবং রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ সীমিত করতে হবে। যদি মব হামলার ক্ষেত্রে তা আইনের আওতায় এনে প্রচারের মাধ্যমে শক্তিশালী সতর্কবার্তা দিতে হবে। পুলিশকে ক্ষমতায়িত করার পাশাপাশি এটি নিশ্চিত করতে হবে যে, তারা যেন হাসিনা সরকারের আমলের নিষ্ঠুর কৌশলগুলোতে ফিরে না যায়। মবের সবচেয়ে বড় শক্তি রাষ্ট্রকে পিছু হটাতে পারা। এই পিছু হটানো বন্ধ করাই বর্তমান সরকারের প্রধান চ্যালেঞ্জ।

সর্বাধিক পঠিত

সম্পর্কিত