সাতজনের কমিটিতে পার মেয়াদের অর্ধেক, যুবদলের কার্যক্রমেও অচলাবস্থা

প্রকাশ : ১৯ এপ্রিল ২০২৬, ২০: ৪৬
স্ট্রিম গ্রাফিক

বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী যুবদলের আংশিক কেন্দ্রীয় কমিটি ঘোষণা করা হয়েছিল ২১ মাস আগে। এরপর গণঅভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতন হয়েছে; অন্তর্বর্তী সরকারের পর ক্ষমতার মসনদে বসেছে বিএনপি। তবে দলটির অঙ্গ-সহযোগী এই সংগঠনের কমিটি আর পূর্ণাঙ্গ হয়নি। কার্যক্রমও আটকে গেছে দিবসভিত্তিক কর্মসূচিতে।

যুবদলের একাধিক নেতা জানান, দীর্ঘদিনেও কমিটি পূর্ণাঙ্গ না হওয়ায় নেতাকর্মীরা সুস্পষ্ট দিকনির্দেশনা পাচ্ছেন না। দীর্ঘ ১৭ বছর নির্যাতন সহ্য করা পদপ্রত্যাশী নেতারাও হয়ে পড়ছেন হতাশাগ্রস্ত। এ ছাড়া সাংগঠনিক দুর্বলতার সুযোগে নেতাকর্মীদের কেউ কেউ জড়াচ্ছেন চাঁদাবাজির মতো অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে। এতে সহযোগিতার বদলে ক্ষমতাসীন বিএনপির বিপদের কারণ হচ্ছে সংগঠনটি।

সবশেষ ২০২৪ সালের ৯ জুলাই আব্দুল মোনায়েম মুন্নাকে সভাপতি ও নুরুল ইসলামকে সাধারণ সম্পাদক করে যুবদলের ৬ সদস্যের কেন্দ্রীয় কমিটি করা হয়। এর কয়েক মাস পর আরেকজন ওই কমিটিতে যুক্ত হন। ওই ৭ সদস্য দিয়েই চলছে কেন্দ্রীয় যুবদল। গঠনতন্ত্র অনুযায়ী, এই কমিটির মেয়াদ ৩ বছর বা ৩৬ মাস। তবে গত ২১ মাসে কমিটি পূর্ণাঙ্গ দূরে থাক কোনো বর্ধিতসভা কিংবা কর্মীসভাই হয়নি।

অবশ্য সংগঠনের সহ-দপ্তর সম্পাদক মিনহাজুল ইসলাম ভূঁইয়ার দাবি, কেন্দ্রে না পারলেও জেলা ও মহানগরীতে ১৪টি নতুন এবং ২৪টি কমিটি পূর্ণাঙ্গ করা হয়েছে। এসব কমিটির বেশ কিছু ইতিবাচক কাজ প্রশংসিতও হয়েছে।

নতুন যন্ত্রণা পরিচয়হীনতা

আওয়ামী লীগ সরকারের ১৭ বছরে নানা নির্যাতন-নিপীড়নের শিকার হয়েছেন যুবদলের নেতাকর্মীরা। হামলা-মামলা ও পুলিশি হয়রানিতে তাদের জীবন ছিল উৎকণ্ঠাময়।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, জুলাই অভ্যুত্থানের পর সেই চিত্র পাল্টেছে। তবে নিপীড়ন বন্ধ হলেও এখন নতুন সংকট হয়ে সামনে এসেছে রাজনৈতিক পরিচয়হীনতা। যেই সংগঠনের জন্য এত কষ্ট সহ্য করা সেখানেই তো নেই তাদের কোনো পরিচয়।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে যুবদলের আগের কমিটির সম্পাদক পর্যায়ের এক নেতা স্ট্রিমকে বলেন, দীর্ঘদিন রাজপথে আন্দোলন-সংগ্রাম করেছি। রাজনীতিকে ভালোবেসেছি। দেশসেরা প্রতিষ্ঠানের ডিগ্রি থাকা সত্ত্বেও কোনো চাকরিতে যোগ দেইনি। প্রতিকূল পরিবেশেও রাজনীতি করে গেছি। এটিই করে যেতে চাই। কিন্তু এর জন্য তো পরিচয় দরকার, সেটিই আমাদের নেই। এর চেয়ে হতাশার আর কি হতে পারে?

সুপরিকল্পিত কার্যক্রমের ঘাটতি

যুব সংগঠন হলেও সংগঠনে যুবসমাজের সম্পৃক্ততার অভাব রয়েছে। গত দুই বছরে উদ্ভাবনী বা সৃজনশীল কোনো কর্মসূচি করতে পারেনি সংগঠনটি। দিবসভিত্তিক গতানুগতিক কার্যক্রমের বাইরে আসা যায়নি। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, জুলাই অভ্যুত্থানের পর রাজনীতিতে পরিবর্তন এলেও যুবদল তার সঙ্গে তাল মেলাতে পারছে না।

ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় কমিটির এক নেতা স্ট্রিমকে বলেন, ‘ছাত্রদলের পরের ধাপটা যুবদল। বর্তমানে যুবদলের দৃশ্যমান এমন কোনো কর্মকাণ্ড নেই, যা দেখে এই প্রজন্মের যুবসমাজ আগ্রহী হবে। এখন দল ক্ষমতায় এসেছে। আমাদের সুচিন্তিতভাবে এমন কাজ করা উচিত যেন এই প্রজন্মের ছাত্র-যুবারা জাতীয়তাবাদী আদর্শের প্রতি ঝোঁকে।’

সংগঠনটির কার্যক্রম বিশ্লেষণে দেখা যায়, গত বছরের ৩১ অক্টোবর প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে শিশু উৎসবের আয়োজন করেছিল যুবদল। দিবসভিত্তিক সেই আয়োজনের পর এককভাবে কেন্দ্রীয় কোনো কর্মসূচি করতে পারেনি সংগঠনটি।

অবশ্য যুবদল সভাপতি আব্দুল মোনায়েম মুন্না কার্যক্রম না থাকার বিষয়টি মানতে নারাজ। তিনি স্ট্রিমকে বলেন, ‘আমি কিন্তু সপ্তাহে দুই-তিন দিনই পার্টি অফিস যাচ্ছি। সংগঠনের কাজেই কিন্তু নিজেকে ব্যস্ত রাখি। আমরা সামাজিক কর্মকাণ্ডও করছি নিয়মিত।’

বিএনপিতে যোগ্য নেতাকর্মীর যোগান নিশ্চিতে যুবদলকে সাংগঠনিকভাবে শক্তিশালী ও সময়োপযোগীভাবে গড়ে তোলা প্রয়োজন বলে জানিয়েছেন বিশ্লেষকরা।

তরুণ রাজনীতি বিশ্লেষক ও বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক আনিসুর রহমান বলেন, বিএনপির যুব সংগঠনের কার্যক্রমে দৃশ্যমান স্থবিরতা রয়েছে। নিয়মিত ও সৃজনশীল রাজনৈতিক উদ্যোগের বদলে কার্যক্রম সীমাবদ্ধ হয়ে পড়েছে দিবস পালন ও প্রটোকলভিত্তিক উপস্থিতির মধ্যে, যা একটি প্রাণবন্ত যুব সংগঠনের প্রত্যাশিত ভূমিকার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক কাজী মো. মাহবুবুর রহমান মনে করেন, বর্তমান প্রেক্ষাপটে বিএনপির অঙ্গসংগঠনগুলোর দায়িত্ব শুধু কর্মসূচি পালনে সীমাবদ্ধ থাকা উচিত নয়। তাদের কর্মী-সমর্থকদের সুনির্দিষ্ট নীতি ও পরিকল্পনা প্রণয়ন এবং সরকারকে নীতিনির্ধারণী পরামর্শ দেওয়ার সক্ষমতা গড়ে তুলতে হবে।

তিনি আরও বলেন, তরুণদের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ এখন বেকারত্ব। এই পরিস্থিতিতে কর্মসংস্থানমুখী পরিকল্পনা, বিনিয়োগের সুযোগ সৃষ্টি, সহজ শর্তে ঋণ সুবিধা এবং সম্ভাবনাময় খাতে দিকনির্দেশনা দেওয়ার উদ্যোগ নিতে হবে যুব সংগঠনগুলোকে। এই ধরনের উদ্যোগের মাধ্যমে মূল দলকে সহযোগিতার পাশাপাশি রাষ্ট্রকে আরও ন্যায়সংগত ও ভারসাম্যপূর্ণভাবে গড়তে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে অঙ্গসংগঠনগুলো।

নেতিবাচক কর্মকাণ্ডে প্রশ্নবিদ্ধ ভাবমূর্তি

সাংগঠনিক স্থবিরতার পাশাপাশি নেতিবাচক কারণেও সংবাদের শিরোনাম হচ্ছেন যুবদলের নেতাকর্মীরা। শুধু গত মার্চ মাসেই সারাদেশে ডিস ব্যবসা দখল, ফিলিং স্টেশনে হামলা, মাদক পরিবহন, মুক্তিযোদ্ধার বাড়িতে ভাঙচুর, মাদক অভিযান চালাতে নিষেধ করাসহ নানা অভিযোগ এসেছে নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে।

যুবদল নেতারা বলছেন, এসব বিষয়ে সাংগঠনিক ব্যবস্থাসহ আইনি পদক্ষেপ নিলেও সংগঠনের ভাবমূর্তি ঠিকই প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছে। আবার প্রতিপক্ষরা রাজনৈতিক ফায়দাও তুলছে।

এ বিষয়ে সংগঠনের সভাপতি আব্দুল মোনায়েম মুন্না বলেন, কিছু দুষ্ট লোক অবশ্যই আছে। আমরা কিন্তু তাদেরকে বা ঘটনাকে অস্বীকার করছি না। জানার সঙ্গে সঙ্গে ব্যবস্থা নিচ্ছি। সংগঠন সবার আগে। এখানে কোনো রকমের শৈথিল্য কিংবা কোনো ধরনের সুবিধা দেওয়ার সুযোগ নেই।

রাজনৈতিক সংস্কৃতির পরিবর্তন হয়েছে দাবি করে কেন্দ্রীয় যুবদলের সাধারণ সম্পাদক ও ভোলা-৪ আসনের সংসদ সদস্য নুরুল ইসলাম নয়ন স্ট্রিমকে বলেন, ‘আগে কিন্তু অস্বীকার করার কালচার ছিল। অন্যায় অস্বীকার করা বা বলতো যে ও আমাদের দলের কেউ না– এমন প্রবণতা ছিল। যেকোনো উপায়ে তাকে সেভ করার একটা প্রবণতা ছিল। আমরা কিন্তু অস্বীকার করার সেই সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে নতুন রাজনৈতিক ধারা তৈরির চেষ্টা করছি।’

তিনি আরও বলেন, প্রমাণ মিললে অপরাধী যেই হোক তার বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। কোথাও শোকজ, কোথাও বহিষ্কার আবার কোথাও কমিটি বিলুপ্ত করা হয়েছে। এমনকি সংগঠনের পক্ষ থেকে মামলাও করা হয়েছে।

অবশ্য কমিটি পূর্ণাঙ্গ না হওয়ায় হতাশা বাড়ার কথা স্বীকার করেন নুরুল ইসলাম নয়ন। তিনি বলেন, এক ধরনের হতাশা আছে। তবে পূর্ণাঙ্গ কমিটির তালিকা জমা দেওয়া আছে। যেকোনো সময় সেটি ঘোষণা হতে পারে।

সর্বাধিক পঠিত

সম্পর্কিত