ad

আক্ষেপের অশ্রুতে ‘সিআর সেভেনে’র বিদায়

স্ট্রিম ডেস্ক
স্ট্রিম ডেস্ক

রেফারির শেষ বাঁশির পর অশ্রুসিক্ত রোনালদো। ছবি : বিবিসি

সব গল্প রূপকথার মতো প্রাপ্তিতে শেষ হয় না। কিছু গল্প শেষ হয় অপূর্ণতায়। ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদোর বিশ্বকাপ-অধ্যায় যেন তেমনই এক গল্প। ছয়টি বিশ্বকাপ, অসংখ্য রেকর্ড আর কোটি মানুষের ভালোবাসা- সবই পেয়েছেন তিনি, শুধু ছোঁয়া হয়নি সোনালি ট্রফিটা।

শেষ ষোলোর লড়াইয়ে গত রাতে স্পেনের বিপক্ষে ইনজুরি টাইমে মিকেল মেরিনোর গোলে ১-০ ব্যবধানে হেরে থমকে গেছে পর্তুগালের চলতি বিশ্বকাপের যাত্রা। আর এই হারের মধ্য দিয়েই পর্দা নামলো রোনালদোর দুই দশকের বিশ্বকাপ ক্যারিয়ারে।

টুর্নামেন্ট শুরুর আগেই তিনি জানিয়ে দিয়েছিলেন, ২০২৬ বিশ্বকাপই হবে তাঁর শেষ। শেষ বাঁশির সঙ্গে সঙ্গেই তাই বিশ্বমঞ্চ থেকে বিদায় লেখা হয়ে গেল প্রজন্মের অন্যতম আলোচিত এই ফুটবলারের।

কান্না ভেজা বিদায়

ম্যাচ শেষের বাঁশি বাজতেই ক্যামেরার লেন্স খুঁজে নিলো রোনালদোকে। হতাশা আর বিষণ্নতায় ভরা নিষ্প্রভ চোখ দুটোতে প্রথমে কান্না আটকানোর চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু কিছুক্ষণের মধ্যেই চোখের জল আর বাঁধ মানেনি। মাঠে তখন তিনি যেন এক বিচ্ছিন্ন দ্বীপ- সতীর্থদের কাছ থেকেও তেমন সাড়া পাননি, কেউ কেউ নিছক আনুষ্ঠানিকতার মতো এসে হাত মিলিয়ে গেছেন।

পর্তুগিজ এই কিংবদন্তির এমন নীরস বিদায়ের পেছনে দায় কোচ রবার্তো মার্তিনেজের, সতীর্থদের, এমনকি রোনালদো নিজেও কম দায়ী নন। সমালোচকদের অভিযোগ, বয়স আর ফিটনেসের সীমাবদ্ধতা নিয়েও পুরো ৯০ মিনিট মাঠে রাখা হয়েছে তাঁকে। অথচ কার্যকর বিকল্প থাকলেও তাকে ব্যবহার করেননি কোচ। সাবেক ইংলিশ ফরোয়ার্ড ক্রিস সাটনের ভাষায়, বিশ্বকাপজুড়ে মাঠে রোনালদোর নড়াচড়ায় স্পষ্ট ছিল বার্ধক্যের ছাপ।

২০০৬ সালে জার্মানিতে শুরু হয়েছিল রোনালদোর প্রথম বিশ্বকাপ-স্বপ্ন। তরুণ এক উইঙ্গার থেকে ধীরে ধীরে তিনি হয়ে ওঠেন দলের নেতা, অধিনায়ক ও অনুপ্রেরণার প্রতীক। ছয়টি বিশ্বকাপের প্রতিটিতেই গোল করে নিজের মোট গোলসংখ্যা দাঁড় করিয়েছেন ১১-তে। সতীর্থদের দিয়ে করিয়েছেন আরও ৫ গোল। চলতি বিশ্বকাপে গোল করে বিশ্বকাপের ছয়টি ভিন্ন আসরে গোল করার আরেক অনন্য কীর্তি গড়েছেন তিনি। বিশ্বফুটবলের মঞ্চে তাঁর সেরা সাফল্য বলতে ২০০৬ বিশ্বকাপের চতুর্থ স্থান; এরপর বহুবার লড়েও আর কখনো সোনালি ট্রফির এত কাছে যেতে পারেননি ক্রিশ্চিয়ানো।

তবে এসব পরিসংখ্যান দিয়ে রোনালদোকে পুরোপুরি ব্যাখ্যা করা যায় না। মাঠে তাঁর ক্ষুধা, হার না মানার মানসিকতা আর প্রতিটি ম্যাচে জয়ের জন্য লড়াই করার অদম্য ইচ্ছাই তাঁকে বারবার আলাদা করেছে। জাতীয় দলের হয়ে তাঁর অবদানও কম নয়— ২০১৬ সালে পর্তুগালকে প্রথম ইউরো চ্যাম্পিয়ন করেছেন, জিতিয়েছেন ২০১৯ ও ২০২৫ সালের উয়েফা নেশন্স লিগ। আন্তর্জাতিক ফুটবলের সর্বোচ্চ গোলদাতা হিসেবেও তাঁর নাম লেখা আছে ইতিহাসের পাতায়।

ম্যাচ শেষে রোনালদো নিজেই স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন তাঁর অর্জনের কথা। তাঁর ভাষায়, ‘আমি আমার সর্বোচ্চটা দেওয়ার চেষ্টা করেছি। পর্তুগালের হয়ে তিনটি শিরোপা জিতেছি। আমার আগে এই দলের কোনো শিরোপাই ছিল না। তাই আমার খুশি হওয়ারই কথা।’

বিদায়ের মুহূর্তেও হার না মানার মানসিকতার ছাপ রেখে রোনালদো বলেছেন, ‘জীবন তো চলতেই থাকবে। আমি বিবেকের কাছে নির্ভার থেকে বিদায় নিচ্ছি। ফুটবলে কখনো জিততে হয়, কখনো হারতে হয়।’

নিজের শোকেসে বহু অর্জন আর ট্রফির মধ্যে সবচেয়ে উঁচু যে বক্সটা বিশ্বকাপের সোনালি ট্রফিটির জন্য বরাদ্দ করেছিলেন, সে জায়গাটা কখনোই পূর্ণ হবে না রোনালদোর। কিন্তু ফুটবল তো ট্রফির হিসাবের বাইরে, মানুষের হৃদয়ে জায়গা করে নেওয়ারও নাম। বিশ্বজুড়ে কোটি ভক্তের হৃদয়ের সেই জায়গাটি আরও বহু আগেই নিজের করে নিয়েছেন সিআর সেভেন।

২০৩০ বিশ্বকাপে গ্যালারি কিংবা টিভির সামনে বসা দর্শকেরা পর্তুগালের জার্সিতে তাঁর চেনা সাত নম্বরটি কিংবা সিউউউ উদ্‌যাপন আর দেখবে না- তবে ফুটবল নামক খেলাটার যে গৌরবময় ইতিহাস, সেখানে চিরকাল ধ্রুবতারা হয়ে থাকবেন ক্রিশ্চিয়ানো ‘দ্য ইনডোমিটেবল’ রোনালদো।

Ad 300x250
সর্বাধিক পঠিত

সম্পর্কিত