ad

দেবদাস, চন্দ্রনাথ, শুভদা… শরৎচন্দ্রের গল্প-উপন্যাস থেকে কতগুলো সিনেমা হয়েছে?

স্ট্রিম গ্রাফিক
স্ট্রিম গ্রাফিক

দেশীয় চলচ্চিত্রে সাহিত্যের প্রভাবের ইতিহাস বেশ পুরোনো। একসময় জনপ্রিয় উপন্যাস বা গল্পকে বড় পর্দায় নিয়ে আসা ছিল নির্মাতাদের কাছে পরিচিত পথ। শক্তিশালী গল্পের পাশাপাশি পরিচিত চরিত্র ও আবেগ; সবকিছু একসঙ্গে পাওয়া যেত সাহিত্য থেকে। বাংলা সাহিত্যের অনেক লেখকের গল্প-উপন্যাস নিয়ে চলচ্চিত্র নির্মিত হলেও শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের অবস্থান এখানে আলাদা। তাঁর সাহিত্য অবলম্বনে বাংলাদেশে মুক্তি পেয়েছে অন্তত ১৩টি চলচ্চিত্র।

আশির দশকে শরৎচন্দ্র ছিলেন বড় পর্দার অন্যতম ভরসা

বাংলাদেশে শরৎচন্দ্রের সাহিত্য নিয়ে চলচ্চিত্র নির্মাণের ধারাটি স্বাধীনতারও আগে শুরু হয়। ১৯৭০ সালের ১৮ সেপ্টেম্বর মুক্তি পাওয়া ‘আপন পর’ দিয়ে এই ধারার সূচনা। শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের ‘বৈকুণ্ঠের উইল’ অবলম্বনে বশীর হোসেন পরিচালিত ছবিটিতে অভিনয় করেন কবরী, জাফর ইকবাল, সবিতা, মাহমুদ সাজ্জাদ, মালতী দে, ইনাম আহমেদ ও খান আতাউর রহমানসহ অনেকে। জাফর ইকবালের বড় পর্দায় অভিষেকও ঘটে এই ছবির মাধ্যমে।

দীর্ঘ বিরতির পর ১৯৮২ সালে চাষী নজরুল ইসলাম নির্মাণ করেন ‘দেবদাস’। ছবিতে দেবদাস, পার্বতী ও চন্দ্রমুখীর চরিত্রে অভিনয় করেন বুলবুল আহমেদ, কবরী ও আনোয়ারা। রহমান, গোলাম মুস্তাফাসহ আরও অনেক শিল্পী ছিলেন ছবিটিতে। বিখ্যাত উপন্যাস থেকে বানানো ছবিটিও দর্শকের কাছে প্রচুর সাড়া পায়।

এর পরের বছরই শরৎচন্দ্রের জনপ্রিয় গল্প ‘কাশীনাথ’ অবলম্বনে আসে ‘বড় বাড়ির মেয়ে’। ১৯৮৩ সালের এই ছবি নির্মাণ করেন আমজাদ হোসেন। অভিনয়ে ছিলেন ববিতা, আলমগীর, ইলিয়াস কাঞ্চন ও প্রবীর মিত্রসহ অনেকে। এর পর ১৯৮৪ সালে চাষী নজরুল ইসলাম আবার ফিরে আসেন শরৎচন্দ্রের সাহিত্যের কাছে। নির্মাণ করেন ‘চন্দ্রনাথ’। নাম ভূমিকায় রাজ্জাকের সঙ্গে অভিনয় করেন দোয়েল, সুচন্দা, গোলাম মুস্তাফা ও সিরাজুল ইসলাম। ছবিটি দর্শকমহলে প্রশংসা অর্জনের পাশাপাশি পাঁচ বিভাগে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারও জিতে নেয়।

১৯৮৫ সালে শরৎচন্দ্রের জনপ্রিয় গল্প ‘রামের সুমতি’ অবলম্বনে শহিদুল আমিন নির্মাণ করেন একই নামের চলচ্চিত্র। ছবির গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রে অভিনয় করেছেন ববিতা, প্রবীর মিত্র, সুচন্দাসহ আরও অনেকে। এই সিনেমার জন্য ববিতা শ্রেষ্ঠ অভিনেত্রী এবং জয় শ্রেষ্ঠ শিশুশিল্পীর জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পান। একই বছরে শরৎচন্দ্রের ‘বৈকুণ্ঠের উইল’ আবারও সিনেমায় আসে ‘সৎ ভাই’ নামে। নায়করাজ রাজ্জাক পরিচালিত ও অভিনীত এই ছবিতে তাঁর সঙ্গে ছিলেন আলীরাজ, নূতন ও মিনু রহমানসহ অনেকে। ছবিটি ব্যবসায়িকভাবেও সফল হয়।

দেবদাস সিনেমার পোস্টার। ছবি: সংগৃহীত
দেবদাস সিনেমার পোস্টার। ছবি: সংগৃহীত

১৯৮৬ সালে চাষী নজরুল ইসলাম নির্মাণ করেন ‘শুভদা’। সিনেমায় অভিনেত্রী আনোয়ারা নাম ভূমিকায় অভিনয় করেন। তাঁর সঙ্গে ছিলেন রাজ্জাক, বুলবুল আহমেদ, জিনাত, গোলাম মুস্তাফাসহ অনেকে। ছবিটি জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারে অসাধারণ সাফল্য পায়।

একই বছর আলমগীর কবির নির্মাণ করেন ‘পরিণীতা’। অঞ্জনা ও ইলিয়াস কাঞ্চনের সঙ্গে অভিনয় করেন আশীষ কুমার লোহসহ অনেকে। আলমগীর কবির পান চিত্রনাট্যের পুরস্কার। ইলিয়াস কাঞ্চন, অঞ্জনা ও আশীষ কুমার লোহ অভিনয়ের বিভিন্ন বিভাগে জাতীয় পুরস্কার অর্জন করেন।

১৯৮৭ সালে শরৎচন্দ্রের ‘শ্রীকান্ত’ অবলম্বনে বুলবুল আহমেদ নির্মাণ করেন ‘রাজলক্ষ্মী ও শ্রীকান্ত’। তিনি নিজেই শ্রীকান্ত চরিত্রে অভিনয় করেন। রাজলক্ষ্মীর ভূমিকায় ছিলেন শাবানা। ছবিটি সেরা চলচ্চিত্রসহ জাতীয় পুরস্কারে স্বীকৃতি পায়।

একই বছরে শরৎচন্দ্রের ‘স্বামী’ গল্প অবলম্বনে নূর উল আলম নির্মাণ করেন ‘স্বামী’। পরের বছর ১৯৮৮ সালে, মহিউদ্দিন ফারুক নির্মাণ করেন ‘বিরাজ বৌ’। ববিতা, ফারুক, রেহানা জলি ও রাজীব ছিলেন গুরুত্বপূর্ণ অভিনয়শিল্পীদের মধ্যে। ছবিতে অভিনয়ের জন্য সুবর্ণা শিরিন জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারে শ্রেষ্ঠ সহ-অভিনেত্রীর স্বীকৃতি পান।

আশির দশকের পর কেন কমে গেল শরৎ সাহিত্যনির্ভর চলচ্চিত্র

আশির দশকের পর শরৎচন্দ্রের সাহিত্য নিয়ে বাংলাদেশে চলচ্চিত্র নির্মাণের গতি অনেকটাই কমে গেলেও তা পুরোপুরি বন্ধ হয়নি। ১৯৯৯ সালে ‘বৈকুণ্ঠের উইল’ গল্প অবলম্বনে অভিনেতা রাজ্জাক আবারও ‘সন্তান যখন শত্রু’ নামে চলচ্চিত্র নির্মাণ করেন।

এরপর ২০০৬ সালে মুশফিকুর রহমান গুলজার নির্মাণ করেন ‘বিন্দুর ছেলে’। শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের গল্প অবলম্বনে নির্মিত ছবিটিতে অভিনয় করেন মৌসুমী, ফেরদৌস, দিতি ও হুমায়ূন ফরীদি।

এরপর ২০১৩ সালে আবারও বড় পর্দায় ফিরে আসে ‘দেবদাস’। প্রায় তিন দশক পর একই পরিচালক চাষী নজরুল ইসলাম শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের একই উপন্যাস নিয়ে নতুন করে চলচ্চিত্র নির্মাণ করেন। এবার দেবদাসের ভূমিকায় শাকিব খান, পার্বতীর চরিত্রে অপু বিশ্বাস এবং চন্দ্রমুখীর ভূমিকায় মৌসুমী অভিনয় করেন। শহীদুজ্জামান সেলিম, আহমেদ শরীফ, কে এস ফিরোজসহ আরও অনেকে অভিনয় করেন।

১৯৮২ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত দেবদাস আর ২০১৩ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত দেবদাস ছবির তুলনা করলে ঢাকাই চলচ্চিত্রের বদলে যাওয়া সময়টাও বোঝা যায়। ১৯৮২ সালের ‘দেবদাস’ সাহিত্যনির্ভর নির্মাণের শক্তিশালী উদাহরণ হতে পারে। এখানে গল্প ও চরিত্র ছিল মূল আকর্ষণ। ২০১৩ সালের ছবিতে তারকাখ্যাতি, আধুনিক নির্মাণপ্রযুক্তি ও নতুন প্রজন্মের দর্শকের প্রত্যাশা বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। অর্থাৎ একই সাহিত্যকর্ম দুই সময়ে দুই ধরনের চলচ্চিত্রের জন্ম দিতে পারে।

আশির দশকের পর শরৎচন্দ্রের সাহিত্য থেকে সিনেমা কমে যাওয়ার কারণ শুধু নির্মাতাদের আগ্রহ কমে যাওয়া নয়। পুরো বিষয়টির পেছনে আরও কিছু বাস্তবতা থাকতে পারে। আশির দশকের বাংলাদেশের চলচ্চিত্রব্যবস্থা, প্রেক্ষাগৃহকেন্দ্রিক দর্শক, সাহিত্যনির্ভর চিত্রনাট্যের প্রতি নির্মাতাদের আস্থা এবং তারকাদের অভিনয়—সবকিছু মিলে একটি উপন্যাসকে চলচ্চিত্রে রূপ দেওয়া তুলনামূলকভাবে স্বাভাবিক সিদ্ধান্ত ছিল। পরবর্তী সময়ে চলচ্চিত্রের বাজার, দর্শকের রুচি, নির্মাণপদ্ধতি এবং গল্প বলার ধরন বদলে যাওয়ায় সেই জায়গা তুলনামূলক সংকুচিত হয়েছে।

কেন শরৎচন্দ্রের সাহিত্য থেকেই এত সিনেমা

ঢাকাই চলচ্চিত্রে অনেক সাহিত্যনির্ভর সিনেমা নির্মিত হয়েছে। এর মধ্যে হুমায়ূন আহমেদের পর সম্ভবত শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের সাহিত্য থেকেই বানানো হয়েছে সবচেয়ে বেশি সংখ্যক সিনেমা। এর কারণ খুঁজতে গেলে প্রথমেই বলতে হয়, শরৎচন্দ্রের গল্পের মানবিকতাই তাঁর সাহিত্যকে চলচ্চিত্রের জন্য এত উপযোগী করে তুলেছে।

তাঁর বেশিরভাগ সাহিত্যের চরিত্ররা আমাদের খুব চেনা মানুষ। তাদেরও পরিবার আছে, সমাজ আছে, সেই সমাজের বিধিনিষেধ তাদের জীবনকেও প্রভাবিত করে। শরতের চরিত্ররাও আমাদের মতো ভালোবাসে, অভিমান করে, রেগে যায়, ভুল করে। ফলে পর্দায় তাদের দেখলে দর্শকের কাছে চরিত্রগুলো দূরের মনে হয় না।

শরৎচন্দ্রের সাহিত্যের সবচেয়ে বড় শক্তিগুলোর একটি নারী চরিত্র। শরৎচন্দ্রের নারী চরিত্রগুলো কেবল নায়কের প্রেমের জন্য বানানো কোনো ‘নারীমূর্তি’ নয়। অনেক সময় তারাই হয়ে ওঠে গল্পের আবেগ ও সংকটের কেন্দ্র। দেবদাস-এর পার্বতী ও চন্দ্রমুখী, বিরাজ বৌ-এর বিরাজ, পরিণীতা-র ললিতা কিংবা শুভদা-র কেন্দ্রীয় চরিত্র, শ্রীকান্ত উপন্যাসের রাজলক্ষ্মী; প্রতিটি চরিত্রের মধ্যেই দুর্দান্ত অভিনয়ের সুযোগ আছে। তাই শরৎচন্দ্রের সাহিত্য থেকে নির্মিত ছবিতে অভিনেত্রীদের জন্যও শক্তিশালী চরিত্র পাওয়া যায়। জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার প্রাপ্তির তালিকাতেও এর প্রতিফলন দেখা যায়। যেমন শুভদা, পরিণীতা, রামের সুমতি, দেবদাসসহ বিভিন্ন চলচ্চিত্রে অভিনয়শিল্পীরা অভিনয়ের জন্য জিতে নিয়েছেন জাতীয় চলচ্চিত্র পুরষ্কার। এছাড়া দর্শকও নারী চরিত্রের আবেগের সঙ্গে নিজের সুখ-দুঃখকে মেলাতে পারেন। নারী চরিত্রের হাসিতে দর্শকরা যেমন আনন্দ পান, তেমনি তাদের চোখের পানি দেখলে দর্শকের হৃদয়ও কষ্ট পায়।

শুভদা সিনেমার পোস্টার। ছবি: সংগৃহীত
শুভদা সিনেমার পোস্টার। ছবি: সংগৃহীত

আরেকটি বিষয় হলো শরৎচন্দ্রের গল্পে আবেগ অনেক বেশি। তাঁর রচিত গল্পে যেমন প্রেম আছে, প্রেমের সঙ্গে শ্রেণিবিদ্বেষ, পরিবারের বাধা, ধর্মীয় ও সামাজিক বিধিনিষেধ, নারীর অবস্থান আর ব্যক্তিগত সিদ্ধান্তের সংঘাতও থাকে। ফলে গল্পকে চলচ্চিত্রে রূপ দেওয়ার সময় নির্মাতার হাতে প্রেমকাহিনির পাশাপাশি সমাজ বাস্তবতাও থাকে।

তবে শরৎচন্দ্রের জনপ্রিয়তার আরেকটি দিক হলো তিনি সমাজকে প্রশ্ন করেছেন, কিন্তু তাঁর গল্প কখনো কেবল বক্তব্যে আটকে থাকেনি। চরিত্রের জীবন ও সম্পর্কের মধ্য দিয়েই সেই প্রশ্নগুলো এসেছে। তাই চলচ্চিত্রে তাঁর গল্প ব্যবহার করলে নির্মাতা একই সঙ্গে আবেগ, নাটকীয়তা ও সামাজিক বাস্তবতা তিনটিই একসঙ্গে পান। অর্থাৎ শরৎ-সাহিত্য অনেক ক্ষেত্রেই ‘একের ভেতর তিন’।

এ কারণেই ১৯৭০ থেকে চার দশকেরও বেশি সময় ধরে তাঁর সাহিত্য বারবার বড় পর্দায় ফিরে এসেছে। মাঝখানে দীর্ঘ বিরতি এসেছে, চলচ্চিত্রের ভাষা বদলেছে, তারকা বদলেছে, দর্শকের রুচিও বদলেছে। কিন্তু তাঁর সৃষ্ট চরিত্রগুলো হারিয়ে যায়নি।

Ad 300x250
লেটেস্ট
সর্বাধিক পঠিত

সম্পর্কিত