হুমায়ূন শফিক

চিত্তরঞ্জন সুতার। বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের অন্যতম নেপথ্য নায়ক। কর্মের মাধ্যমেই রাজনৈতিক ইতিহাসে আখ্যা পেয়েছে ‘রহস্য’ পুরুষের। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ‘আস্থাভাজন’ চিত্তরঞ্জন ভারত এবং মুজিবনগর সরকারের সেতুবন্ধনে কাজ করেছিলেন।
আলোর নিচেই অন্ধকারের অবস্থান। জীবনের শেষ অধ্যায়ে চিত্তরঞ্জনও এমন কর্মকাণ্ডে হয়েছেন বিতর্কিত। আওয়ামী লীগের সংসদ সদস্য হয়ে তিনি শেখ মুজিবুর রহমানের বাকশাল গঠনে প্রভাব রেখেছেন। নামের সঙ্গে যুক্ত করেছেন বাংলাদেশে ভারতের বিশেষ গোয়েন্দা সংস্থা চরের।
চিত্তরঞ্জন সুতার ১৯২৮ সালের ২৩ মার্চ ব্রিটিশের বেঙ্গল প্রেসিডেন্সির অন্তর্গত বাকেরগঞ্জ জেলার (বর্তমান পিরোজপুর) স্বরূপকাঠির বাটনাতলা গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বিএ করেন তিনি। একপর্যায়ে ব্রিটিশবিরোধী বিপ্লবী সতীন সেনের ভাতিজি মঞ্জুশ্রী সেনকে বিয়ে করেন। এই সম্পর্ক চিত্তরঞ্জনের মধ্যে উপনিবেশবাদবিরোধী চেতনার উন্মেষ ঘটায়।
১৯৪৭ সালে দেশ ভাগের পর চিত্তরঞ্জন পশ্চিমবঙ্গের উদ্বাস্তু ক্যাম্পে যান। উপলব্ধি করেন, ‘ত্রাণের মানসিকতা বাস্তুচ্যুত হিন্দুদের একটি অলস, কর্মবিমুখ ও পরনির্ভরশীল করছে। ত্রাণ দিয়ে কোনো জাতির আত্মমর্যাদা রক্ষা করা সম্ভব নয়। বরং অধিকার আদায়ের জন্য মাতৃভূমিতে ফিরে রাজনৈতিক সংগ্রাম অপরিহার্য।’ এরপরই মূলত পূর্ব পাকিস্তানে ফিরে মূলধারার রাজনীতিতে সম্পৃক্ত হন চিত্তরঞ্জন সুতার। তৃণমূলে ব্যাপক জনসংযোগ করেন এবং ১৯৫৪ সালের নির্বাচনে মাত্র ২৬ বছর বয়সে নির্দলীয় প্রার্থী হিসেবে প্রাদেশিক পরিষদের সদস্য (এমএলএ) নির্বাচিত হন।
ষাটের দশকের শুরুতে শেখ মুজিবুর রহমানের সঙ্গে সখ্য গড়েন চিত্তরঞ্জন। ১৯৬৭ সালের ১৭ মার্চ শেখ মুজিবুর রহমানের সঙ্গে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে বন্দি ছিলেন তিনি। বঙ্গবন্ধু তাঁর দিনলিপিতে উল্লেখ করেছেন, ‘চিত্তরঞ্জন সুতার সেদিন তাঁকে জন্মদিনের বিশেষ শুভেচ্ছা হিসেবে একটি লাল গোলাপ দিয়েছিলেন।’
ষাটের দশকের শেষভাগে বৃহত্তর রাজনৈতিক সংগ্রামের পূর্ব প্রস্তুতি হিসেবে শেখ মুজিবুর রহমান ভারত সরকারের সঙ্গে নিবিড় যোগাযোগের জন্য চিত্তরঞ্জন সুতারকে বেছে নেন। তাঁর নির্দেশেই পূর্ব পাকিস্তান ছেড়ে কলকাতায় স্থায়ী হন চিত্তরঞ্জন।
১৯৭০ সালের নির্বাচনের প্রাক্কালে মওলানা হামিদ খান ভাসানী যখন ধর্মের ভিত্তিতে পাকিস্তানকে প্রত্যাখ্যানের ডাক দেন, তখন চিত্তরঞ্জন সুতার ও কালিদাস বৈদ্য অনুধাবন করেন– এভাবে পূর্ববঙ্গ স্বাধীন হলে হিন্দুদের সমঅধিকার নিশ্চিত হবে না। এজন্য অসাম্প্রদায়িক বাঙালি জাতীয়তাবাদের ভিত্তিতে হিন্দু ভোটারদের আওয়ামী লীগের পতাকাতলে ঐক্যবদ্ধ করতে চিত্তরঞ্জন ‘গণমুক্তি দল’ গঠন করেন, যা সত্তরের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের জয়ে অন্যতম ভূমিকা রাখে।
মুক্তিযুদ্ধ ও সানি ভিলা
কলকাতার ভবানীপুরের ২৬ প্রসাদ রোডের বাসভবন ‘সানি ভিলাকে’ চিত্তরঞ্জন সুতার ১৯৭১ সালে প্রবাসী বাংলাদেশ সরকার ও ভারত সরকারের মধ্যে গোপন রাজনৈতিক ও সামরিক কেন্দ্রে পরিণত করেন। ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ কালরাতের পর তাজউদ্দীন আহমদ প্রথম কলকাতায় পৌঁছালে, নিরাপত্তার স্বার্থে চিত্তরঞ্জন সুতারের ঠিকানা মুখস্থ রেখেছিলেন।
মুজিবনগর সরকার গঠনের পর চিত্তরঞ্জন আনুষ্ঠানিকভাবে ভারত সরকার এবং মুজিবনগর সরকারের মধ্যে প্রধান সংযোগরক্ষাকারীর দায়িত্ব নেন। বলা হয়, তিনি ‘র’-এর সঙ্গে ঘনিষ্ঠ, মুক্তিযোদ্ধাদের প্রশিক্ষণ, গোয়েন্দা তথ্য বিনিময় ও শরণার্থীদের ত্রাণ বিতরণে সমন্বয়কের ভূমিকা পালন করেন।
বিতর্কিত সাত দফা চুক্তি
মুক্তিযুদ্ধে ভূমিকার কারণে চিত্তরঞ্জন সুতার যেমন প্রশংসিত, তেমনি বিতর্কিত কিছু গোপন চুক্তির কারণে। ১৯৭১ সালে ভারত ও প্রবাসী বাংলাদেশ সরকারের মধ্যে গোপনীয় ‘সাত দফা চুক্তি’ হয়। আর এই চুক্তিতে চিত্তরঞ্জন সুতার ছিলেন অন্যতম মধ্যস্থতাকারী।
বিশ্লেষকদের মতে, চুক্তির শর্তগুলো ছিল সদ্য স্বাধীন হতে চলা বাংলাদেশের সার্বভৌমত্বের জন্য অত্যন্ত অবমাননাকর এবং ভারতের প্রতি দীর্ঘমেয়াদি নির্ভরশীলতা তৈরির কৌশলী দলিল। বলা হয়, চুক্তির শর্তাবলী এতই কঠিন ছিল যে, এতে স্বাক্ষর করার পরপরই সৈয়দ নজরুল ইসলাম মানসিক চাপে জ্ঞান হারিয়েছিলেন। এটিকে ‘চাণক্য নীতির’ প্রয়োগ হিসেবে দেখা হয়, যেখানে আশ্রয়ের বিনিময়ে রাষ্ট্রীয় আত্মসমর্পণ বাধ্য করা হয়।
স্বাধীন বাংলাদেশ ও বাকশাল গঠনে ভূমিকা
১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর বাংলাদেশ স্বাধীন হয়। এরপর চিত্তরঞ্জন বাংলাদেশে ফেরেন। ১৯৭৩ সালের প্রথম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তিনি আওয়ামী লীগের মনোনীত প্রার্থী হিসেবে বাকেরগঞ্জ-১৪ আসন থেকে নির্বাচিত হন।
১৯৭৫ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি বহুদলীয় গণতন্ত্র বিলুপ্ত করে একদলীয় শাসনব্যবস্থা ‘বাংলাদেশ কৃষক শ্রমিক আওয়ামী লীগ (বাকশাল)’ গঠন করেন শেখ মুজিবুর রহমান। এই নতুন রাজনৈতিক ব্যবস্থা গঠনে চিত্তরঞ্জন সুতারের শক্তিশালী ভূমিকা রয়েছে। তিনি কেবল সমর্থকই ছিলেন না, বরং আতাউর রহমান খান, বেগম মতিয়া চৌধুরী, মোহাম্মদ ফরহাদদের মতো জাতীয় নেতাদের সমান্তরালে নবগঠিত বাকশালের কেন্দ্রীয় কমিটির এক প্রভাবশালী সদস্য হিসেবে মনোনীত হয়েছিলেন।
পঁচাত্তরের পটপরিবর্তন ও স্থায়ী নির্বাসন
১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যা করা হয়। এরপর বাংলাদেশের রাজনীতির অভিমুখ পাল্টে যায়। রাষ্ট্রীয় সংবিধানে ধর্মনিরপেক্ষতার মূলনীতি বাতিল হয়। চরম নিরাপত্তাহীনতায় চিত্তরঞ্জন সুতার ১৯৭৫ সালের আগস্টে দেশত্যাগ করে ভারতে আশ্রয় নেন। কলকাতার পুরোনো ঠিকানা ‘সানি ভিলায়’ স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন। ১৯৭৯ সালে ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী মোরারজি দেশাই ভারতীয় সংসদে জানান– ‘চিত্তরঞ্জন সুতারসহ আরও ৩৯ নেতাকে ভারতে রাজনৈতিক আশ্রয় দেওয়া হয়েছে’।
বিচ্ছিন্নতাবাদের অভিযোগ
চিত্তরঞ্জন সুতারের জীবনের সবচেয়ে বিতর্কিত অধ্যায় হলো ‘বঙ্গভূমি’ বা ‘বীর বঙ্গ’ নামে বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলনে সম্পৃক্ততা। যিনি অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠায় আজীবন লড়েছেন, তিনিই পরে উগ্রহিন্দুত্ববাদী সংগঠনের সর্বাধিনায়ক হয়েছেন।
বাংলাদেশে হিন্দু সম্প্রদায়ের জনসংখ্যা ১৯৭৪ সালের ১৩.৫ শতাংশ থেকে কমে যাওয়ার প্রতিক্রিয়া এবং হারানো সম্পত্তি উদ্ধারে এই আন্দোলন গড়ে তোলে চিত্তরঞ্জন। আন্দোলনের মূল লক্ষ্য ছিল– বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের ছয় জেলা (যশোর, কুষ্টিয়া, খুলনা, বরিশাল, ফরিদপুর এবং পটুয়াখালী) নিয়ে ‘স্বাধীন বঙ্গভূমি’ বা ‘বীর বঙ্গ হিন্দু প্রজাতন্ত্র’ কায়েম করা। প্রস্তাবিত এই রাষ্ট্রের রাজধানী পার্বত্য চট্টগ্রামের ‘শক্তিগড়’ নির্ধারণ করা হয়েছিল।
এর একটি সশস্ত্র শাখা ছিল ‘বঙ্গসেনা’, যার কমান্ডার ছিলেন কালীদাস বৈদ্য। নিজস্ব পতাকার পাশাপাশি ‘বঙ্গবাণী’ নামে একটি রেডিও স্টেশন চালুর পরিকল্পনা ছিল তাদের। ২০০৪ সালে তৎকালীন বিডিআর (বর্তমান বিজিবি) মহাপরিচালক মেজর জেনারেল জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী অভিযোগ করেন, চিত্তরঞ্জন সুতারের নেতৃত্বে ‘বীর বঙ্গ’ ভারতের মাটিতে বসে বাংলাদেশের বিরুদ্ধে সশস্ত্র ষড়যন্ত্র ও গুপ্তহত্যা চালাচ্ছে। সীমান্ত এলাকায় তাদের প্রায় ৯০টি ক্যাম্প সক্রিয় ছিল বলেও জানান তিনি।
বিশ্লেষকদের ধারণা, ১৯৭১ সালে ‘সানি ভিলা’ যেমন পাকিস্তান ভাঙার কাজে ব্যবহৃত হয়েছিল, তেমনি স্বাধীন বাংলাদেশের ওপর মনস্তাত্ত্বিক ও কূটনৈতিক চাপ সৃষ্টির জন্য ভারত এটিকে ‘দ্বিতীয় ফ্রন্ট’ হিসেবে ব্যবহার করেছিল। যদিও ২০০১ সালে বিবিসিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে চিত্তরঞ্জন সুতার বাংলাদেশে পৃথক হিন্দু রাষ্ট্র গঠনের দাবির সঙ্গে সম্পৃক্ততা অস্বীকার করেন।
রহস্যে ঘেরা বিদায়
৫৩ বছরের রাজনৈতিক জীবনের প্রায় ৩৯ বছর ভারতে কাটানো চিত্তরঞ্জন রাজনীতিকের মৃত্যু ছিল রহস্যে ঘেরা। ২০০২ সালের নভেম্বরে তৎকালীন বিরোধীদলীয় নেতা শেখ হাসিনা ভারত সফরে গেলে চিত্তরঞ্জন সুতার তাঁর মধ্যস্থতাকারী হিসেবে নয়াদিল্লিতে উপস্থিত হয়েছিলেন। সেই রুদ্ধদ্বার বৈঠকের সময় ২০০২ সালের ২৭ নভেম্বর নয়াদিল্লির একটি হোটেলে মারা যান তিনি।
চিত্তরঞ্জন সুতারের জীবন ও কর্ম বাংলাদেশের ইতিহাসে আজও জটিল ধাঁধা। একদিকে তিনি দেশপ্রেমিক, বঙ্গবন্ধুর ঘনিষ্ঠ সহচর ও মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম নায়ক; অন্যদিকে স্বদেশের মাটিতেই বিতর্কিত বিচ্ছিন্নতাবাদী নেতা এবং আধিপত্যবাদের সহযোগী। এই দ্বৈত সত্তা চিত্তরঞ্জনকে বাংলার রাজনীতির ‘রহস্য’ পুরুষে পরিণত করেছে।
তথ্যসূত্র
মুজিববাহিনী থেকে গণবাহিনী, আলতাফ পারভেজ
রাজনীতির রহস্যপুরুষ চিত্তরঞ্জন সুতার - সংগ্রামের নোটবুক
On my birthday - The Financial Express.
Provisional Government of Bangladesh - Wikipedia.
love humanity | Page 28 - sufi borshan.
The Forgotten Warrior Chittaranjan Sutars Contribution to Bangladeshs Freedom - YouTube.
RAW's Covert Operations in Bangladesh | PDF | Espionage - Scribd.
RAW and Bangladesh - Scribd.
Near East & South Asia - DTIC.
The Jamaat-e-Islami and the undoing of Mujib's Sonar Bangla - The New Indian Express.
InshAllah Bangladesh: An Urgent Book Exploring South Asia - The Blogs.
February Month Articles - Hindu Vivek Kendra.
The Daily Star Web Edition Vol. 4 Num 223 - The Daily Star Archive.

চিত্তরঞ্জন সুতার। বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের অন্যতম নেপথ্য নায়ক। কর্মের মাধ্যমেই রাজনৈতিক ইতিহাসে আখ্যা পেয়েছে ‘রহস্য’ পুরুষের। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ‘আস্থাভাজন’ চিত্তরঞ্জন ভারত এবং মুজিবনগর সরকারের সেতুবন্ধনে কাজ করেছিলেন।
আলোর নিচেই অন্ধকারের অবস্থান। জীবনের শেষ অধ্যায়ে চিত্তরঞ্জনও এমন কর্মকাণ্ডে হয়েছেন বিতর্কিত। আওয়ামী লীগের সংসদ সদস্য হয়ে তিনি শেখ মুজিবুর রহমানের বাকশাল গঠনে প্রভাব রেখেছেন। নামের সঙ্গে যুক্ত করেছেন বাংলাদেশে ভারতের বিশেষ গোয়েন্দা সংস্থা চরের।
চিত্তরঞ্জন সুতার ১৯২৮ সালের ২৩ মার্চ ব্রিটিশের বেঙ্গল প্রেসিডেন্সির অন্তর্গত বাকেরগঞ্জ জেলার (বর্তমান পিরোজপুর) স্বরূপকাঠির বাটনাতলা গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বিএ করেন তিনি। একপর্যায়ে ব্রিটিশবিরোধী বিপ্লবী সতীন সেনের ভাতিজি মঞ্জুশ্রী সেনকে বিয়ে করেন। এই সম্পর্ক চিত্তরঞ্জনের মধ্যে উপনিবেশবাদবিরোধী চেতনার উন্মেষ ঘটায়।
১৯৪৭ সালে দেশ ভাগের পর চিত্তরঞ্জন পশ্চিমবঙ্গের উদ্বাস্তু ক্যাম্পে যান। উপলব্ধি করেন, ‘ত্রাণের মানসিকতা বাস্তুচ্যুত হিন্দুদের একটি অলস, কর্মবিমুখ ও পরনির্ভরশীল করছে। ত্রাণ দিয়ে কোনো জাতির আত্মমর্যাদা রক্ষা করা সম্ভব নয়। বরং অধিকার আদায়ের জন্য মাতৃভূমিতে ফিরে রাজনৈতিক সংগ্রাম অপরিহার্য।’ এরপরই মূলত পূর্ব পাকিস্তানে ফিরে মূলধারার রাজনীতিতে সম্পৃক্ত হন চিত্তরঞ্জন সুতার। তৃণমূলে ব্যাপক জনসংযোগ করেন এবং ১৯৫৪ সালের নির্বাচনে মাত্র ২৬ বছর বয়সে নির্দলীয় প্রার্থী হিসেবে প্রাদেশিক পরিষদের সদস্য (এমএলএ) নির্বাচিত হন।
ষাটের দশকের শুরুতে শেখ মুজিবুর রহমানের সঙ্গে সখ্য গড়েন চিত্তরঞ্জন। ১৯৬৭ সালের ১৭ মার্চ শেখ মুজিবুর রহমানের সঙ্গে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে বন্দি ছিলেন তিনি। বঙ্গবন্ধু তাঁর দিনলিপিতে উল্লেখ করেছেন, ‘চিত্তরঞ্জন সুতার সেদিন তাঁকে জন্মদিনের বিশেষ শুভেচ্ছা হিসেবে একটি লাল গোলাপ দিয়েছিলেন।’
ষাটের দশকের শেষভাগে বৃহত্তর রাজনৈতিক সংগ্রামের পূর্ব প্রস্তুতি হিসেবে শেখ মুজিবুর রহমান ভারত সরকারের সঙ্গে নিবিড় যোগাযোগের জন্য চিত্তরঞ্জন সুতারকে বেছে নেন। তাঁর নির্দেশেই পূর্ব পাকিস্তান ছেড়ে কলকাতায় স্থায়ী হন চিত্তরঞ্জন।
১৯৭০ সালের নির্বাচনের প্রাক্কালে মওলানা হামিদ খান ভাসানী যখন ধর্মের ভিত্তিতে পাকিস্তানকে প্রত্যাখ্যানের ডাক দেন, তখন চিত্তরঞ্জন সুতার ও কালিদাস বৈদ্য অনুধাবন করেন– এভাবে পূর্ববঙ্গ স্বাধীন হলে হিন্দুদের সমঅধিকার নিশ্চিত হবে না। এজন্য অসাম্প্রদায়িক বাঙালি জাতীয়তাবাদের ভিত্তিতে হিন্দু ভোটারদের আওয়ামী লীগের পতাকাতলে ঐক্যবদ্ধ করতে চিত্তরঞ্জন ‘গণমুক্তি দল’ গঠন করেন, যা সত্তরের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের জয়ে অন্যতম ভূমিকা রাখে।
মুক্তিযুদ্ধ ও সানি ভিলা
কলকাতার ভবানীপুরের ২৬ প্রসাদ রোডের বাসভবন ‘সানি ভিলাকে’ চিত্তরঞ্জন সুতার ১৯৭১ সালে প্রবাসী বাংলাদেশ সরকার ও ভারত সরকারের মধ্যে গোপন রাজনৈতিক ও সামরিক কেন্দ্রে পরিণত করেন। ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ কালরাতের পর তাজউদ্দীন আহমদ প্রথম কলকাতায় পৌঁছালে, নিরাপত্তার স্বার্থে চিত্তরঞ্জন সুতারের ঠিকানা মুখস্থ রেখেছিলেন।
মুজিবনগর সরকার গঠনের পর চিত্তরঞ্জন আনুষ্ঠানিকভাবে ভারত সরকার এবং মুজিবনগর সরকারের মধ্যে প্রধান সংযোগরক্ষাকারীর দায়িত্ব নেন। বলা হয়, তিনি ‘র’-এর সঙ্গে ঘনিষ্ঠ, মুক্তিযোদ্ধাদের প্রশিক্ষণ, গোয়েন্দা তথ্য বিনিময় ও শরণার্থীদের ত্রাণ বিতরণে সমন্বয়কের ভূমিকা পালন করেন।
বিতর্কিত সাত দফা চুক্তি
মুক্তিযুদ্ধে ভূমিকার কারণে চিত্তরঞ্জন সুতার যেমন প্রশংসিত, তেমনি বিতর্কিত কিছু গোপন চুক্তির কারণে। ১৯৭১ সালে ভারত ও প্রবাসী বাংলাদেশ সরকারের মধ্যে গোপনীয় ‘সাত দফা চুক্তি’ হয়। আর এই চুক্তিতে চিত্তরঞ্জন সুতার ছিলেন অন্যতম মধ্যস্থতাকারী।
বিশ্লেষকদের মতে, চুক্তির শর্তগুলো ছিল সদ্য স্বাধীন হতে চলা বাংলাদেশের সার্বভৌমত্বের জন্য অত্যন্ত অবমাননাকর এবং ভারতের প্রতি দীর্ঘমেয়াদি নির্ভরশীলতা তৈরির কৌশলী দলিল। বলা হয়, চুক্তির শর্তাবলী এতই কঠিন ছিল যে, এতে স্বাক্ষর করার পরপরই সৈয়দ নজরুল ইসলাম মানসিক চাপে জ্ঞান হারিয়েছিলেন। এটিকে ‘চাণক্য নীতির’ প্রয়োগ হিসেবে দেখা হয়, যেখানে আশ্রয়ের বিনিময়ে রাষ্ট্রীয় আত্মসমর্পণ বাধ্য করা হয়।
স্বাধীন বাংলাদেশ ও বাকশাল গঠনে ভূমিকা
১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর বাংলাদেশ স্বাধীন হয়। এরপর চিত্তরঞ্জন বাংলাদেশে ফেরেন। ১৯৭৩ সালের প্রথম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তিনি আওয়ামী লীগের মনোনীত প্রার্থী হিসেবে বাকেরগঞ্জ-১৪ আসন থেকে নির্বাচিত হন।
১৯৭৫ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি বহুদলীয় গণতন্ত্র বিলুপ্ত করে একদলীয় শাসনব্যবস্থা ‘বাংলাদেশ কৃষক শ্রমিক আওয়ামী লীগ (বাকশাল)’ গঠন করেন শেখ মুজিবুর রহমান। এই নতুন রাজনৈতিক ব্যবস্থা গঠনে চিত্তরঞ্জন সুতারের শক্তিশালী ভূমিকা রয়েছে। তিনি কেবল সমর্থকই ছিলেন না, বরং আতাউর রহমান খান, বেগম মতিয়া চৌধুরী, মোহাম্মদ ফরহাদদের মতো জাতীয় নেতাদের সমান্তরালে নবগঠিত বাকশালের কেন্দ্রীয় কমিটির এক প্রভাবশালী সদস্য হিসেবে মনোনীত হয়েছিলেন।
পঁচাত্তরের পটপরিবর্তন ও স্থায়ী নির্বাসন
১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যা করা হয়। এরপর বাংলাদেশের রাজনীতির অভিমুখ পাল্টে যায়। রাষ্ট্রীয় সংবিধানে ধর্মনিরপেক্ষতার মূলনীতি বাতিল হয়। চরম নিরাপত্তাহীনতায় চিত্তরঞ্জন সুতার ১৯৭৫ সালের আগস্টে দেশত্যাগ করে ভারতে আশ্রয় নেন। কলকাতার পুরোনো ঠিকানা ‘সানি ভিলায়’ স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন। ১৯৭৯ সালে ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী মোরারজি দেশাই ভারতীয় সংসদে জানান– ‘চিত্তরঞ্জন সুতারসহ আরও ৩৯ নেতাকে ভারতে রাজনৈতিক আশ্রয় দেওয়া হয়েছে’।
বিচ্ছিন্নতাবাদের অভিযোগ
চিত্তরঞ্জন সুতারের জীবনের সবচেয়ে বিতর্কিত অধ্যায় হলো ‘বঙ্গভূমি’ বা ‘বীর বঙ্গ’ নামে বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলনে সম্পৃক্ততা। যিনি অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠায় আজীবন লড়েছেন, তিনিই পরে উগ্রহিন্দুত্ববাদী সংগঠনের সর্বাধিনায়ক হয়েছেন।
বাংলাদেশে হিন্দু সম্প্রদায়ের জনসংখ্যা ১৯৭৪ সালের ১৩.৫ শতাংশ থেকে কমে যাওয়ার প্রতিক্রিয়া এবং হারানো সম্পত্তি উদ্ধারে এই আন্দোলন গড়ে তোলে চিত্তরঞ্জন। আন্দোলনের মূল লক্ষ্য ছিল– বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের ছয় জেলা (যশোর, কুষ্টিয়া, খুলনা, বরিশাল, ফরিদপুর এবং পটুয়াখালী) নিয়ে ‘স্বাধীন বঙ্গভূমি’ বা ‘বীর বঙ্গ হিন্দু প্রজাতন্ত্র’ কায়েম করা। প্রস্তাবিত এই রাষ্ট্রের রাজধানী পার্বত্য চট্টগ্রামের ‘শক্তিগড়’ নির্ধারণ করা হয়েছিল।
এর একটি সশস্ত্র শাখা ছিল ‘বঙ্গসেনা’, যার কমান্ডার ছিলেন কালীদাস বৈদ্য। নিজস্ব পতাকার পাশাপাশি ‘বঙ্গবাণী’ নামে একটি রেডিও স্টেশন চালুর পরিকল্পনা ছিল তাদের। ২০০৪ সালে তৎকালীন বিডিআর (বর্তমান বিজিবি) মহাপরিচালক মেজর জেনারেল জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী অভিযোগ করেন, চিত্তরঞ্জন সুতারের নেতৃত্বে ‘বীর বঙ্গ’ ভারতের মাটিতে বসে বাংলাদেশের বিরুদ্ধে সশস্ত্র ষড়যন্ত্র ও গুপ্তহত্যা চালাচ্ছে। সীমান্ত এলাকায় তাদের প্রায় ৯০টি ক্যাম্প সক্রিয় ছিল বলেও জানান তিনি।
বিশ্লেষকদের ধারণা, ১৯৭১ সালে ‘সানি ভিলা’ যেমন পাকিস্তান ভাঙার কাজে ব্যবহৃত হয়েছিল, তেমনি স্বাধীন বাংলাদেশের ওপর মনস্তাত্ত্বিক ও কূটনৈতিক চাপ সৃষ্টির জন্য ভারত এটিকে ‘দ্বিতীয় ফ্রন্ট’ হিসেবে ব্যবহার করেছিল। যদিও ২০০১ সালে বিবিসিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে চিত্তরঞ্জন সুতার বাংলাদেশে পৃথক হিন্দু রাষ্ট্র গঠনের দাবির সঙ্গে সম্পৃক্ততা অস্বীকার করেন।
রহস্যে ঘেরা বিদায়
৫৩ বছরের রাজনৈতিক জীবনের প্রায় ৩৯ বছর ভারতে কাটানো চিত্তরঞ্জন রাজনীতিকের মৃত্যু ছিল রহস্যে ঘেরা। ২০০২ সালের নভেম্বরে তৎকালীন বিরোধীদলীয় নেতা শেখ হাসিনা ভারত সফরে গেলে চিত্তরঞ্জন সুতার তাঁর মধ্যস্থতাকারী হিসেবে নয়াদিল্লিতে উপস্থিত হয়েছিলেন। সেই রুদ্ধদ্বার বৈঠকের সময় ২০০২ সালের ২৭ নভেম্বর নয়াদিল্লির একটি হোটেলে মারা যান তিনি।
চিত্তরঞ্জন সুতারের জীবন ও কর্ম বাংলাদেশের ইতিহাসে আজও জটিল ধাঁধা। একদিকে তিনি দেশপ্রেমিক, বঙ্গবন্ধুর ঘনিষ্ঠ সহচর ও মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম নায়ক; অন্যদিকে স্বদেশের মাটিতেই বিতর্কিত বিচ্ছিন্নতাবাদী নেতা এবং আধিপত্যবাদের সহযোগী। এই দ্বৈত সত্তা চিত্তরঞ্জনকে বাংলার রাজনীতির ‘রহস্য’ পুরুষে পরিণত করেছে।
তথ্যসূত্র
মুজিববাহিনী থেকে গণবাহিনী, আলতাফ পারভেজ
রাজনীতির রহস্যপুরুষ চিত্তরঞ্জন সুতার - সংগ্রামের নোটবুক
On my birthday - The Financial Express.
Provisional Government of Bangladesh - Wikipedia.
love humanity | Page 28 - sufi borshan.
The Forgotten Warrior Chittaranjan Sutars Contribution to Bangladeshs Freedom - YouTube.
RAW's Covert Operations in Bangladesh | PDF | Espionage - Scribd.
RAW and Bangladesh - Scribd.
Near East & South Asia - DTIC.
The Jamaat-e-Islami and the undoing of Mujib's Sonar Bangla - The New Indian Express.
InshAllah Bangladesh: An Urgent Book Exploring South Asia - The Blogs.
February Month Articles - Hindu Vivek Kendra.
The Daily Star Web Edition Vol. 4 Num 223 - The Daily Star Archive.

গ্যাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেসের (৬ মার্চ ১৯২৭, কলম্বিয়া-১৭ এপ্রিল ২০১৪, মেক্সিকো) র্নিজন হাত উঠে আসে মানবসমাজের বিস্তার ও নিঃসঙ্গতার পরিণতির দলিল নিয়ে। আমরা দেখি, হোসে আর্কাদিও বুয়েন্দিয়াকে; ঘুমহীনতার হাত থেকে বাঁচতে কীভাবে পালিয়ে গেলো আর পত্তন করল নিঃসঙ্গতা ও মাকোন্দো গ্রাম।
৫ ঘণ্টা আগে
১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধ বাঙালি জাতির ইতিহাসে এক গৌরবোজ্জ্বল অধ্যায়, যেখানে স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা রূপ নেয় সশস্ত্র সংগ্রামে। এই সংগ্রামকে কার্যকর ও সুসংগঠিত করতে একটি রাজনৈতিক নেতৃত্ব ও প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো ছিল অপরিহার্য।
৬ ঘণ্টা আগে
রাস্তাঘাটে তুচ্ছ ঘটনায় কথা কাটাকাটি, রিকশাচালকের সঙ্গে অহেতুক তর্ক কিংবা বাসে কন্ডাক্টরের সঙ্গে বাগবিতণ্ডা—সবই যেন আমাদের রাস্তাঘাটের চেনা চিত্র। কিন্তু গরম আসলে এমন পরিস্থিতি আরও বেড়ে যায়।
১০ ঘণ্টা আগে
বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে মুজিবনগর সরকার গঠন ছিল একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। ১৯৭১ সালের ১০ এপ্রিল আনুষ্ঠানিকভাবে এই সরকার গঠিত হয় এবং ১৭ এপ্রিল মেহেরপুরের বৈদ্যনাথতলার আম্রকাননে (পরবর্তীতে মুজিবনগর নামকরণ) শপথ গ্রহণের মাধ্যমে তা কার্যকর হয়। তাই দিনকে ‘মুজিবনগর দিবস’ বলা হয়। তবে কোন সরকার মু
১ দিন আগে