মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তি: মিশরের ‘দূরত্বে’র আসল রহস্য কী?

প্রকাশ : ১৯ আগস্ট ২০২৬, ১৭: ৫৯
স্ট্রিম গ্রাফিক
স্ট্রিম গ্রাফিক

২০২৬ সালের ৭ আগস্ট সৌদি আরবের মক্কা নগরীর আল-সাফা প্যালেসে সৌদি আরব, পাকিস্তান এবং তুরস্কের মধ্যে স্বাক্ষরিত হয়েছে ‘মক্কা চুক্তি’। জাতিসংঘ সনদের ৫১ অনুচ্ছেদের অধীনে ব্যক্তিগত ও যৌথ আত্মরক্ষার অধিকারের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে এই ঐতিহাসিক চুক্তিতে স্বাক্ষরকারী দেশগুলোর যেকোনো একটির ওপর সশস্ত্র আক্রমণকে তিন দেশের সবার ওপর আক্রমণ হিসেবে গণ্য করা হবে মর্মে বিধান রাখা হয়েছে।

বলার অপেক্ষা রাখে না, ন্যাটোর আদলে একটি সমন্বিত প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার দিকে পা বাড়িয়েছে এই তিন দেশ। কিন্তু এই বড় কৌশলগত পরিবর্তনের ঠিক প্রাক্কালেই প্রশ্ন উঠেছে অন্য একটি শক্তিকে ঘিরে। শুরুতে এই আঞ্চলিক নিরাপত্তা কাঠামোর অংশ হিসেবে মিশরও চার দেশীয় (সৌদি আরব, তুরস্ক, পাকিস্তান ও মিশর) নিরাপত্তা পরামর্শমূলক আলোচনার মূল টেবিলে ছিল। কিন্তু চূড়ান্ত মুহূর্তে এসে কায়রো এই চুক্তিতে স্বাক্ষর করা থেকে বিরত থাকে। বাহ্যিকভাবে একে আকস্মিক মনে হলেও, এর নেপথ্যে রয়েছে গভীর কৌশলগত, ভূ-রাজনৈতিক এবং ঐতিহাসিক হিসাব-নিকাশ।

কেন এই জোটে থাকল না মিশর

মিশরের নীতিনির্ধারকদের দীর্ঘমেয়াদী কৌশল হলো, কোনো একক সামরিক বা রাজনৈতিক ব্লকের স্থায়ী ছাতার নিচে না গিয়ে স্বাধীন কূটনৈতিক দরকষাকষির ক্ষমতা ধরে রাখা। সৌদি নেতৃত্বাধীন এই ধরনের একটি আনুষ্ঠানিক ও কঠোর প্রতিরক্ষা জোটে যদি কায়রো শুরুতেই জড়িয়ে পড়ত, তবে মধ্যপ্রাচ্য ও এর বাইরের অন্যান্য বৈশ্বিক শক্তির সঙ্গে তাদের স্বাধীন সম্পর্কের সমীকরণগুলো জটিল হয়ে পড়ার আশঙ্কা ছিল। বিশেষ করে সুয়েজ খালের মতো অত্যন্ত সংবেদনশীল সামুদ্রিক পথ এবং মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতিতে ঐতিহ্যগতভাবে মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালন করে আসা মিশরের জন্য একটি বিশেষ সামরিক জোটে আবদ্ধ হওয়া মানেই নিজেদের কূটনৈতিক পরিসরকে সংকুচিত করে ফেলা।

পূর্ব ভূমধ্যসাগর ও এশীয় শক্তির সমীকরণে মিশরের কৌশল কী

পূর্ব ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলে জ্বালানি সম্পদ আহরণ ও সামুদ্রিক সীমানা নিয়ন্ত্রণকে কেন্দ্র করে সৃষ্ট ভূ-রাজনৈতিক দ্বন্দ্বে মিশর কখনোই আঙ্কারার পক্ষে অবস্থান নেয়নি। ২০১৯ সালে মিশর, গ্রিস ও সাইপ্রাসের উদ্যোগে গঠিত ‘ইস্ট মেডিটেরানিয়ান গ্যাস ফোরাম’-এর মাধ্যমে কায়রো এথেন্স ও নিকোসিয়ার সঙ্গে অত্যন্ত গভীর কৌশলগত ও জ্বালানি অংশীদারিত্ব গড়ে তুলেছে। ২০২০ সালে মিশর ও গ্রিসের মধ্যে স্বাক্ষরিত সামুদ্রিক সীমানা নির্ধারণ চুক্তি তারই বাস্তব প্রমাণ, যা তুরস্কের তথাকথিত ‘ব্লু হোম’ নীতিকে সরাসরি চ্যালেঞ্জ করেছিল। অথচ এই গ্রিস ও সাইপ্রাসের সঙ্গেই তুরস্কের তীব্র বৈরী ও ঐতিহাসিক ভূ-রাজনৈতিক বিরোধ বিদ্যমান রয়েছে।

অন্যদিকে ভারতের সঙ্গে মিশরের সাম্প্রতিক অর্থনৈতিক, বাণিজ্যিক ও যৌথ সামরিক সহযোগিতা অত্যন্ত দ্রুত গতিতে বৃদ্ধি পাচ্ছে। উদাহরণস্বরূপ, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে মিসরীয় ও ভারতীয় সশস্ত্র বাহিনীর মধ্যে যৌথ সামরিক মহড়া এবং প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম আমদানির মতো দ্বিপক্ষীয় উদ্যোগগুলো দুই দেশের সুসম্পর্ককে নতুন উচ্চতা দিয়েছে।

গ্রিস, সাইপ্রাস ও ভারতের মতো ঐতিহ্যগত মিত্রদের সঙ্গে দূরত্ব তৈরি হওয়ার ঝুঁকি এড়িয়েই মিশর মক্কা চুক্তি থেকে সচেতনভাবে নিজেকে দূরে সরিয়ে রেখেছে। তবে তুরস্ক, সৌদি আরব ও পাকিস্তানের মধ্যে স্বাক্ষরিত যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তিতে মিসর যোগ দিতে পারে বলে জানিয়েছেন তুর্কি প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ান। তিনি বলেছেন, ভবিষ্যতে আরও দেশকে এ চুক্তিতে যুক্ত করার সুযোগ রয়েছে। আল–জাজিরা আরবির অনুষ্ঠান ‘আল মুকাবালা’তে দেওয়া এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে এরদোয়ান এ কথা বলেন।


আবুধাবির অবস্থান কতটা প্রভাব ফেলেছিল

মধ্যপ্রাচ্যের ক্ষমতার ভারসাম্যে সৌদি আরব এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতের সম্পর্ক সবসময়ই এক জটিল সমীকরণের মধ্য দিয়ে গেছে। দুই দেশের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক স্বার্থের বেশ কিছু ক্ষেত্রে সূক্ষ্ম ভিন্নতা এবং সুপ্ত আঞ্চলিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা রয়েছে। বিশেষ করে ইয়েমেন সংকট, লোহিত সাগরীয় নিরাপত্তা এবং সুদানের অভ্যন্তরীণ সংঘাতের মতো বিষয়গুলোতে আবুধাবি ও রিয়াদের অবস্থান সবসময় এক বিন্দুতে মেলেনি।

সৌদি-প্রভাবিত এই নতুন সামরিক জোটে হুট করে জড়িয়ে পড়লে সংযুক্ত আরব আমিরাতের সঙ্গে কায়রোর দীর্ঘদিনের পরীক্ষিত ও অত্যন্ত ঘনিষ্ট সম্পর্কে অপ্রয়োজনীয় টানাপোড়েন তৈরি হতে পারত—এমন একটি জোরালো সংশয় মিশরের ডিপ্লোম্যাটিক ও নিরাপত্তা মহলে ছিল। অর্থনৈতিক সহযোগিতা এবং আঞ্চলিক সহায়তার জন্য আমিরাতের ওপর মিশরের নির্ভরশীলতার বিষয়টিও এই সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে একটি অদৃশ্য নিয়ামক হিসেবে কাজ করেছে। তাছাড়া ইরানের হামলার জবাবে মিসর আবুধাবিতে আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা ও যুদ্ধবিমান পাঠিয়েছিল জানা যায়। যুদ্ধ চলাকালে সিসি একাধিকবার সংযুক্ত আরব আমিরাতের প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ বিন জায়েদের সঙ্গেও সাক্ষাৎ করেছেন।

অভ্যন্তরীণ আইনি বাধ্যবাধকতা ও সাংবিধানিক সীমাবদ্ধতাগুলো কী

মিশরের সংবিধানে দেশের বাইরে বা বিদেশে সামরিক মোতায়েন, যুদ্ধ ঘোষণা এবং বড় ধরনের স্থায়ী সামরিক জোট বা ব্লকে যোগদানের বিষয়ে অত্যন্ত কঠোর আইনি ও সাংবিধানিক বিধিনিষেধ রয়েছে।

অতীতে বিভিন্ন আঞ্চলিক সংঘাতে জড়িয়ে পড়ার তিক্ত অভিজ্ঞতা থেকে মিশর শিক্ষা নিয়েছে। ইয়েমেন বা অন্য কোনো দূরের আঞ্চলিক সংঘাতে স্বয়ংক্রিয়ভাবে জড়িয়ে পড়ার যেকোনো ধরনের আইনি ও সামরিক ঝুঁকি এড়াতে মিশর সবসময় এ ধরনের যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি এবং রক্তক্ষয়ী সামরিক জোট থেকে নিরাপদ দূরত্ব বজায় রেখে চলে। মিশরের পার্লামেন্ট এবং সামরিক হাইকমান্ডের অভ্যন্তরীণ নীতিও এই ধরনের বহুজাতিক নিরাপত্তা চুক্তির ক্ষেত্রে অত্যন্ত রক্ষণশীল।

রিয়াদ ও কায়রোর নিজস্ব নিরাপত্তা অগ্রাধিকারের ফারাক কোথায়

সৌদি আরব তার নিজের ভৌগোলিক নিরাপত্তা, তেল ক্ষেত্রগুলোর সুরক্ষা এবং ক্রমবর্ধমান আঞ্চলিক উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে নিজের সুরক্ষাকে বহুগুণ শক্তিশালী করতে এই চুক্তির আশু তাগিদ অনুভব করেছিল। কিন্তু মিসরের ক্ষেত্রে নিরাপত্তা হুমকিগুলো মূলত দেশের অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতা, অর্থনৈতিক সংকট মোকাবিলা, গাজা সীমান্ত তথা ফিলিস্তিন ইস্যু এবং লোহিত সাগরের দক্ষিণাঞ্চলের নিরাপত্তা কেন্দ্রিক। রিয়াদের ভূ-রাজনৈতিক উচ্চাকাঙ্ক্ষার সঙ্গে কায়রোর এই জাতীয় নিরাপত্তা অগ্রাধিকার ও হুমকির ধরণ এক না হওয়ায়, শেষ পর্যন্ত কায়রো এই চূড়ান্ত চুক্তি থেকে নিজেদের গুটিয়ে নেওয়ার যৌক্তিক কারণ খুঁজে পায়।

তবে এও জানা যায় যে, প্রতিরক্ষা চুক্তিতে মিসরকে অন্তর্ভুক্ত করার বিরোধিতা করেছিল সৌদি আরব। মিসরকে চুক্তিতে অন্তর্ভুক্ত করার পক্ষে তুরস্ক জোর দিলেও সৌদি আরব এতে রাজি হয়নি। ওই আলোচনার বিষয়ে অবগত তিনটি সৌদি সূত্র মিডল ইস্ট আইকে এ কথা জানিয়েছেন। ওই সব সূত্রের একজন সৌদি রাজপরিবারের সাবেক এক জ্যেষ্ঠ উপদেষ্টা। তিনি বলেন, রিয়াদ চায়নি মিসর ‘অন্তত এখনই’ এই চুক্তিতে যোগ দিক। বিষয়টি স্পর্শকাতর হওয়ায় তিন সৌদি কর্মকর্তার কেউ-ই নাম প্রকাশে রাজি হননি। তাঁরা প্রত্যেকে বলেছেন, মিসরের প্রেসিডেন্ট আবদেল ফাত্তাহ আল-সিসির সরকারের প্রতি অসন্তোষ থেকেই সৌদি আরব এমন অবস্থান নিয়েছে। রিয়াদের ধারণা, একসময় মিসরের যে কৌশলগত ও সামরিক গুরুত্ব ছিল, তা এখন আর নেই।

আঞ্চলিক নিরাপত্তা মঞ্চের ভবিষ্যৎ রূপরেখা কোন দিকে এগোচ্ছে

চুক্তি স্বাক্ষরকালে তুরস্ক ও সৌদির পক্ষ থেকে স্পষ্টভাবে জানানো হয়েছে যে এই প্রতিরক্ষা চুক্তিটি ভ্রাতৃপ্রতিম অন্যান্য দেশের জন্য সর্বদা উন্মুক্ত রাখা হয়েছে। এর অর্থ হলো, এটি কোনো একমুখী বা বন্ধ দরজা বিশিষ্ট সামরিক জোট নয়। ভবিষ্যতে মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতির পরিবর্তনের ওপর নির্ভর করে মিশরের এতে যুক্ত হওয়ার বা কোনো না কোনো আকারে সহযোগিতা বাড়ানোর দরজা খোলা রয়েছে।

সংযুক্ত আরব আমিরাতের প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ বিন জায়েদের সাবেক উপদেষ্টা ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক আবদুলখালেক আবদুল্লাহ পাকিস্তানের অর্থনৈতিক সংকট নিয়ে ব্যঙ্গ করেছেন এবং নতুন আঞ্চলিক নিরাপত্তা ব্যবস্থার আওতায় সৌদি আরবকে রক্ষা করার ক্ষেত্রে দেশটির ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। গত শুক্রবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে তিনি লিখেছেন, এটি ‘সময়ের এক অদ্ভুত পরিহাস’। যে দেশের ‘এক-চতুর্থাংশ মানুষ দরিদ্র’ এবং ‘এক-তৃতীয়াংশ মানুষ’ নিরক্ষর, সেই দেশ বিশ্বের শীর্ষ ২০টি অর্থনীতির একটি দেশকে রক্ষা করার অবস্থানে নিজেকে ‘সুবিধাবাদী’ অবস্থানে দাঁড় করিয়েছে। পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি ও পারমাণবিক অস্ত্রের প্রসঙ্গ টেনে তিনি আরও বলেন, পাকিস্তান ‘প্রতিষ্ঠার পর থেকেই দুর্নীতিগ্রস্ত সামরিক শাসন, দীর্ঘস্থায়ী অভ্যন্তরীণ অস্থিরতা এবং নিকটবর্তী প্রতিবেশীদের সঙ্গে যুদ্ধে ভুগেছে’। দেশটির একমাত্র প্রধান যোগ্যতা হলো তাদের ‘১৭০টি পারমাণবিক বোমা’। তবে এর উত্তরে ওআইসির সংস্থা ‘ইসেসকো’র সাবেক প্রধান আবদুলআজিজ আলতোয়াইজরি ইসরায়েলের সঙ্গে আমিরাতের সম্পর্কের দিকে ইঙ্গিত দিয়ে আবদুল্লাহর পোস্টের জবাবে লিখেছেন, ‘যারা বিশ্বাসঘাতকতা করে জায়নবাদীদের সঙ্গে হাত মেলাবে, তারা কখনোই নিরাপত্তা খুঁজে পাবে না।’ এই প্রেক্ষাপটে মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তি স্বাক্ষর থেকে নিজেদের দূরে সরিয়ে রাখা মিশরের জন্য কি সুবিধা বয়ে আনবে তা ভবিষ্যৎই বলে দেবে।

সুমন সুবহান: নিরাপত্তা বিশ্লেষক

Ad 300x250
লেটেস্ট
সর্বাধিক পঠিত

সম্পর্কিত

মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তি: মিশরের ‘দূরত্বে’র আসল রহস্য কী?