সরকারি ও বেসরকারি তথ্য-দ্বৈরথের সমাধান কোথায়

সম্পাদকীয় প্রতীকী ছবি। স্ট্রিম গ্রাফিক

সম্প্রতি ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) বিএনপি সরকারের প্রথম ১০০ দিনের কাজের ওপর একটি পর্যবেক্ষণমূলক প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। এতে মানবাধিকার ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির বেশ কিছু উদ্বেগজনক চিত্র উঠে এসেছে। বিশেষ করে ৬০৫টি খুন ও ১৯৬টি অপহরণের পরিসংখ্যান জনমনে অস্বস্তি তৈরি করেছে। এই প্রতিবেদনের প্রেক্ষিতে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বিষয়টিকে সরাসরি নাকচ করে দিয়েছেন। তাঁর দাবি, টিআইবির প্রতিবেদনটি মূলত সংবাদপত্রের খবরের কাটিংয়ের ওপর ভিত্তি করে তৈরি। এটি কোনো যথাযথ তদন্ত নয়। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জেলাভিত্তিক তথ্যের বিপরীতে তিনি বর্তমান আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিকে অনেক বেশি ইতিবাচক হিসেবে দাবি করেছেন।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর এই প্রতিক্রিয়ার জবাবে ৯ জুন টিআইবি স্পষ্ট করেছে যে, তারা কেবল সংবাদপত্রের প্রতিবেদনের ওপর নির্ভর করেনি। বাংলাদেশ পুলিশ এবং তিনটি সুপরিচিত মানবাধিকার সংগঠনের তথ্য বিশ্লেষণ করেই প্রতিবেদনটি তৈরি হয়েছে। তাদের মতে, সরকারি মহলের উচিত এ ধরনের তথ্যকে নেতিবাচক হিসেবে না দেখে গঠনমূলক সমালোচনা হিসেবে গ্রহণ করে অপরাধ দমনে আরও কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া।

দুর্ভাগ্যজনক হলো, আমাদের দেশে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান ও নাগরিক সমাজের মধ্যকার এই দূরত্ব নতুন নয়। ২০২৪-এর আগের প্রেক্ষাপট পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, টিআইবি বা অনুরূপ সংস্থার কোনো প্রতিবেদন প্রকাশিত হলে তৎকালীন সরকারের মন্ত্রীরা সেগুলোকে ‘দেশি-বিদেশি চক্রান্ত’ বা ‘ভিত্তিহীন’ আখ্যা দিতেন। বর্তমানে সরাসরি ‘দেশদ্রোহী’ বলা না হলেও, গবেষণার গ্রহণযোগ্যতা ধুলিসাৎ করার জন্য প্রতিবেদন অনির্ভরযোগ্য প্রমাণের যে চেষ্টা আমরা দেখছি, তা অনেকটা অতীতেরই প্রতিধ্বনি।

উন্নত ও গণতান্ত্রিক দেশগুলোতে স্বাধীন গবেষণার প্রতিবেদনকে রাষ্ট্রের ‘আয়না’ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। সুইডেন, নরওয়ে বা যুক্তরাজ্যের মতো দেশে কোনো অডিট সংস্থা অনিয়মের রিপোর্ট করলে সরকার তা ‘ষড়যন্ত্র’ না ভেবে সংসদীয় কমিটিতে আলোচনার জন্য উন্মুক্ত করে দেয়। যুক্তরাজ্যে ‘পাবলিক অ্যাকাউন্টস কমিটি’ ওই রিপোর্টের ভিত্তিতে সরকারি কর্মকর্তাদের সংসদে জবাবদিহির মুখোমুখি করে। জার্মানির মতো দেশগুলোতে সরকার সমালোচনার ভিত্তিতে জনমতের সঙ্গে সরাসরি সংলাপে বসে। যুক্তরাজ্যের ‘অফিস ফর স্ট্যাটিসটিক্স রেগুলেশন’, যুক্তরাষ্ট্রের ‘গভর্নমেন্ট অ্যাকাউন্টেবিলিটি অফিস’, অস্ট্রেলিয়ার ‘অস্ট্রেলিয়ান ব্যুরো অব স্ট্যাটিস্টিক্স’, ইউরোপীয় ইউনিয়নের ‘ইওরোস্ট্যাট’-এর মতো স্বীকৃত ও স্বাধীন প্ল্যাটফর্ম থাকে। এরা সরকারি তথ্যের সত্যতা যাচাই করে জনগণের আস্থা নিশ্চিত করে।

আমাদের দেশে সরকার ও বেসরকারি সংস্থার তথ্যের মধ্যে বড় ধরনের ব্যবধানের কারণে জনমনে বিভ্রান্তি তৈরি হয়। এ ধরনের তিক্ত বিতর্ক নিরসনে সরকারি তথ্যের সত্যতা যাচাই করার জন্য একটি স্বাধীন ও স্বীকৃত প্ল্যাটফর্ম গঠন করা জরুরি। এমন প্ল্যাটফর্ম থাকলে তথ্যের উৎস বা ‘কমন সোর্স’ নিয়ে বিভ্রান্তি কমত এবং কোনো পক্ষেরই অতিরঞ্জিত পরিসংখ্যান দেওয়ার সুযোগ থাকত না।

রাজনৈতিক সদিচ্ছা, আইনি সুরক্ষা ও প্রয়োজনীয় কারিগরি সক্ষমতা নিশ্চিত করতে পারলে বাংলাদেশেও এমন একটি স্বাধীন ডেটা-ভেরিফিকেশন প্ল্যাটফর্ম গড়ে তোলা সম্ভব। প্রকৃত সুশাসন নিশ্চিত করতে রাষ্ট্র ও নাগরিক সমাজের তথ্যের এই ‘দুই মেরু’র অবস্থান ঘুচিয়ে একটি যৌক্তিক ভিত্তির ওপর দাঁড় করানো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

সম্পর্কিত