হাসিবুর রহমান

২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থান বাংলাদেশের রাজনীতির ইতিহাসে এক নতুন বাঁক বদল। ৫ আগস্ট শেখ হাসিনার পতন এবং দেশত্যাগের মধ্য দিয়ে দীর্ঘ ১৭ বছরের আওয়ামী শাসনের অবসান ঘটে। আন্দোলনের মূলে থাকা ছাত্র-জনতার চাহিদার পরিপ্রেক্ষিতে ৮ আগস্ট নোবেল বিজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে গঠিত হয় অন্তর্বর্তী সরকার। এই সরকারের অংশ হন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের অন্যতম দুই মুখ নাহিদ ইসলাম ও আসিফ মাহমুদ সজিব ভূঁইয়া। পরবর্তী সময়ে এই তালিকায় যুক্ত হন আন্দোলনের আরেক মুখ মাহফুজ আলম।
তবে সরকারের বাইরে থেকে জুলাই আন্দোলনের চেতনাকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়ার লক্ষ্যে কিছু রাজনৈতিক ও সামাজিক উদ্যোগ শুরু হয়। উদ্যোগগুলো সময়ের ব্যবধানে জটিল ও বহুমুখী রূপ লাভ করে। অন্তর্বর্তী সরকার গঠনের ঠিক এক মাস পরে যাত্রা শুরু করে রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্ম জাতীয় নাগরিক কমিটি। সেখান থেকে গত দেড় বছরে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) এবং নানা বিভক্তিতে এনসিপিসহ সবমিলিয়ে অন্তত হাফ ডজন রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্মের আবির্ভাব ঘটেছে। বিশ্লেষকদের মতে, আদর্শিক দ্বন্দ্ব, নেতৃত্বের প্রতিযোগিতা এবং কৌশলগত পার্থক্যের কারণে জুলাই বিপ্লবের মূল শক্তিগুলো আজ খণ্ড-বিখণ্ড।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট শেখ হাসিনার ক্ষমতাচ্যুতির পরের মাসের ৮ সেপ্টেম্বর নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীকে আহ্বায়ক এবং আখতার হোসেনকে সদস্যসচিব করে ৫৫ সদস্যের ‘জাতীয় নাগরিক কমিটি’ ঘোষণা করা হয়। এই প্ল্যাটফর্মটি ছিল মূলত বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতাকর্মীদের নিয়ে গঠিত একটি বৃহত্তর সামাজিক উদ্যোগ। একপর্যায়ে এই কমিটি একটি পূর্ণাঙ্গ রাজনৈতিক দলে রূপ নেওয়ার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করে।

২০২৫ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) গঠিত হয়। এই নতুন দলের হাল ধরতে ২৫ ফেব্রুয়ারি অন্তর্বর্তী সরকারের তথ্য ও সম্প্রচার এবং ডাক ও টেলিযোগাযোগ উপদেষ্টার পদ থেকে পদত্যাগ করেন নাহিদ ইসলাম। দলটির প্রতিষ্ঠাকালীন আহ্বায়ক হন নাহিদ ইসলাম নিজে এবং সদস্যসচিব হন আখতার হোসেন। এনসিপি গঠনের সময় দাবি করা হয়েছিল, এটি হবে একটি অংশগ্রহণমূলক ও বৈষম্যহীন রাজনৈতিক শক্তি। তবে দল গঠনের প্রক্রিয়া শুরু হওয়ার পরপরই এর ভেতরকার অভ্যন্তরীণ কোন্দল ও আদর্শিক ফাটল প্রকাশ্যে আসতে শুরু করে।
এনসিপি গঠনের প্রক্রিয়ায় শুরুতেই ধাক্কা লাগে ইসলামী ছাত্রশিবিরের সাবেক নেতাদের সঙ্গে মতবিরোধের কারণে। জাতীয় নাগরিক কমিটিতে শিবিরের সাবেক কেন্দ্রীয় নেতাদের শক্তিশালী অবস্থান ছিল। কিন্তু যখন এই কমিটি থেকে রাজনৈতিক দল (এনসিপি) প্রতিষ্ঠা হয়, তখন তারা বিভিন্ন অভিযোগ তুলে সরে যান। তাদের প্রধান অভিযোগ ছিল সংগঠনের অর্থনৈতিক অস্বচ্ছতা এবং দলটিকে একটি সুস্পষ্ট ‘মধ্য-ডানপন্থী’ দল হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে না পারা।

এরই ধারাবাহিকতায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ইসলামী ছাত্রশিবিরের সাবেক সভাপতি আলী আহসান জুনায়েদ এবং মোহাম্মদ হিযবুল্লাহর নেতৃত্বে গঠিত হয় ‘ইউনাইটেড পিপলস বাংলাদেশ’ (আপ বাংলাদেশ)। ২০২৫ সালের ৯ মে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে এই সংগঠনের আত্মপ্রকাশ ঘটে। তবে এই ভাঙন এখানেই শেষ হয়নি। সম্প্রতি ২০২৬ সালের ৩ এপ্রিল নাঈম আহমাদকে আহ্বায়ক করে গঠিত হয়েছে জাস্টিস অ্যান্ড ডেমোক্রেসি পার্টি (জেডিপি)। নাঈম আহমাদ এর আগে ‘আপ-বাংলাদেশ’ গঠনের প্রক্রিয়ায় যুক্ত ছিলেন, অর্থাৎ এটি ভাঙনের ভেতরে আরও একটি ভাঙন।
এনসিপির ভেতরে শুধু ডানপন্থীরাই নয়, সাবেক বামপন্থী ছাত্রনেতাদের সঙ্গেও দূরত্ব তৈরি হয়। ২০২৫ সালের অক্টোবর মাসে এনসিপির যুগ্ম সদস্য সচিব মঈনুল ইসলাম তুহিন, যুগ্ম আহ্বায়ক অনিক রায় এবং কেন্দ্রীয় সদস্য অলিক মৃ পদত্যাগ করেন। তাদের অভিযোগ ছিল, এনসিপি মূলত ‘সংগঠন’ বা ‘রাজনীতি’ কোনোটিতেই সফল হতে পারছে না।

এই পদত্যাগী অংশটি এবং বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের অন্যতম সমন্বয়ক নাজিফা জান্নাতসহ ২০২৬ সালের ১৬ জানুয়ারি গঠন করেন নেটওয়ার্ক ফর পিপলস অ্যাকশন (এনপিএ)। ছাত্র ইউনিয়ন এবং এনসিপির সাবেক নেতা অনিক রায় হন এনপিএ’র কাউন্সিল সদস্য, এনসিপির সাবেক যুগ্ম সদস্য সচিব তুহিন খান হন এই প্লাটফর্মের মুখপাত্র। এছাড়া বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন এবং ছাত্র ইউনিয়নের আরেক নেত্রী নাজিফা জান্নাতও মুখপাত্র হিসেবে এই প্লাটফর্মে রয়েছেন।
জুলাই আন্দোলনের বুদ্ধিবৃত্তিক নেতা ও অন্তর্বর্তী সরকারের সাবেক উপদেষ্টা মাহফুজ আলমও এনসিপির সঙ্গে একীভূত হননি। ২০২৬ সালের ৬ মার্চ তিনি ‘অল্টারনেটিভস’ নামে একটি নতুন রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্ম ঘোষণা করেন। ১৭ সদস্যের এই ন্যাশনাল অরগানাইজিং কমিটিতে এনসিপির সাবেক কয়েকজন নেতাও যোগ দেন। মাহফুজ আলমের এই উদ্যোগটি মূলত তরুণদের রাজনীতিতে ইতিবাচক অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার লক্ষ্যে গঠিত হয়েছে বলে জানানো হয়।
অন্যদিকে, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সাবেক সদস্য সচিব এবং এনসিপির সাবেক যুগ্ম সদস্যসচিব আরিফ সোহেলও এনসিপি থেকে পদত্যাগ করে এ বছরের ১০ ফেব্রুয়ারি ‘গণবিপ্লবী উদ্যোগ’ নামে একটি প্ল্যাটফর্ম গঠন করেন। চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানের চেতনাকে ধারণ করে একটি প্রকৃত গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র গড়ার দাবি নিয়ে এই সংগঠনটি কাজ করছে।
এদিকে ২০২৪ সালের ১৩ আগস্ট গঠিত ‘ইনকিলাব মঞ্চ’ নিজস্ব ধারায় রাজনীতিতে সক্রিয় ছিল। এর প্রতিষ্ঠাতা শরীফ ওসমান বিন হাদি এক সময় নাগরিক কমিটির সদস্য ছিলেন। তবে গত ডিসেম্বরে দুর্বৃত্তের গুলিতে আহত হয়ে তাঁর মৃত্যুর পর ইনকিলাব মঞ্চের নেতৃত্বে আসেন আব্দুল্লাহ আল জাবের।
জাতীয় নাগরিক কমিটির অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা মুখপাত্র ও জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক সামান্তা শারমিন স্ট্রিমকে বলেন, ‘সবার সক্ষমতাকে একসঙ্গে ধারণে এনসিপি ব্যর্থ হয়েছে। আমরা প্রত্যেকের স্বতন্ত্র বৈচিত্র ও সক্ষমতাকে গুরুত্ব দেওয়ার রাজনৈতিক সংস্কৃতিও গড়ে তুলতে পারিনি।’
এনসিপির ভাঙনের বিষয়ে তিনি বলেন, ‘একটি দলকে ভোটে জিততে হলে অ্যাবসলিউট পাওয়ার পলিটিক্সে যুক্ত হতে হয়, যেটি এনসিপি করেছে। ফলে বুদ্ধিবৃত্তিক নীতি প্রণয়নের (পলিসি মেকিং) মতো বিষয় সেকেন্ডারি হয়ে পড়েছে। তবে যারা আলাদা হয়ে নতুন প্ল্যাটফর্ম গড়ছেন, তারা সেই শূন্যস্থান পূরণ করতে চাইছেন। তবে দলত্যাগ ও প্ল্যাটফর্মগুলোর বিভক্তির দায় আমি এবং আমার সিনিয়র নেতৃত্বকে নিতে হবে।’
একটি অভিন্ন লক্ষ্য নিয়ে শুরু হওয়া আন্দোলনে কেন এতগুলো বিভক্তি— জানতে চাইলে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, রাজনৈতিক বিশ্লেষক ড. কে এম মহিউদ্দীন বলেন, ‘এই বিভাজন মূলত নেতৃত্বের লড়াই এবং কৌশলের ভিন্নতা।’
ঢাকা স্ট্রিমকে তিনি বলেন, ‘এই যে এতগুলো প্ল্যাটফর্ম তৈরি হলো, এটি প্রমাণ করে যে তাদের মধ্যে সংহতির অভাব রয়েছে। তারা যখন সরকারে গেল কিংবা রাজনৈতিক দল গঠন করতে চাইল, তখনই তাদের জনপ্রিয়তা কমতে শুরু করে। এনসিপি বা এই ধরনের নতুন দলগুলোর সামনে নিজস্ব কোনো কংক্রিট আদর্শ নেই।’
জাসদের উদাহরণ দিয়ে তিনি বলেন, ‘জাসদ যখন ভেঙেছিল, তখন তাদের সামনে বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্রের মতো একটি আদর্শ ছিল। কিন্তু এই নতুন দলগুলোর বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠছে তারা জামায়াতের বি-টিম বা সি-টিম হিসেবে কাজ করছে। এই জনসন্দেহ তাদের ভবিষ্যৎকে অনিশ্চিত করে তুলছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘জুলাই অভ্যুত্থানের যে কাঙ্ক্ষিত ফলাফল; অর্থাৎ খুনিদের বিচার এবং টেকসই সংস্কার—তা ধীরগতিতে চলায় পাবলিক পারসেপশন এখন নেতিবাচক হয়ে পড়ছে। সাধারণ মানুষ এখন এই খণ্ড-বিখণ্ড প্ল্যাটফর্মগুলোর চেয়ে মূল সমস্যার সমাধান বেশি চাচ্ছে।’
একই বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক ড. সাব্বির আহমেদ বলেন, ‘একটি রাজনৈতিক দলের ভবিষ্যৎ নির্ভর করে তার আদর্শ এবং জনসম্পৃক্ততার ওপর। এনসিপির শুরুটা আশাব্যঞ্জক হলেও তারা সঠিক ‘কোর্স অফ অ্যাকশন’ নিতে পারেনি। যারা আন্দোলনে ছিল তারা বহু মত ও পথের মানুষ। কিন্তু কোটা সংস্কার আন্দোলনের পর তাদের মধ্যে ঐক্যের আর কোনো শক্ত ভিত্তি অবশিষ্ট থাকেনি। বাম, ডান ও মধ্যপন্থীদের এই জগাখিচুড়ি অবস্থা দলটিকে টিকিয়ে রাখতে ব্যর্থ হয়েছে।’
তিনি যোগ করেন, ‘সামান্থা শারমিন বা মাহফুজ আলম কিংবা অন্য নেতারা যখন এনসিপির সঙ্গে জামায়াতের ঘনিষ্ঠতা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন, তখন বোঝা যায় তাদের মধ্যে আদর্শিক স্পষ্টতা আছে। প্রত্যেকেই এখন জুলাইয়ের চেতনাকে নিজেদের মতো করে ব্যাখ্যা করছে এবং আলাদা আলাদা দোকান খুলছে। এতে আল্টিমেটলি জুলাই অভ্যুত্থানের মূল শক্তিই দুর্বল হয়ে পড়ছে।’
জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর নতুন বন্দোবস্তের যে আশার আলো জেগেছিল, তা এখন বহু খণ্ডে বিভক্ত। এনসিপি থেকে শুরু করে আপ-বাংলাদেশ, এনপিএ, অল্টারনেটিভস, গণবিপ্লবী উদ্যোগ কিংবা জেডিপি—সবার মুখে এক ‘জুলাইয়ের চেতনা’ থাকলেও রাজপথে তাদের সম্মিলিত উপস্থিতি নেই। বরং একে অপরের বিরুদ্ধে অভিযোগ এবং নেতৃত্বের দ্বন্দ্বে তারা এখন জনবিচ্ছিন্ন হওয়ার ঝুঁকিতে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই ছোট ছোট প্ল্যাটফর্মগুলো যদি একটি একক শক্তিশালী রাজনৈতিক কাঠামো দাঁড় করাতে না পারে, তবে ভবিষ্যতে দেশের মূল ধারার রাজনীতিতে তারা কেবল ‘চাপ সৃষ্টিকারী গোষ্ঠী’ হিসেবেই টিকে থাকতে পারে। তবে তরুণ নেতৃত্বের ওপর সাধারণ মানুষের যে এককালীন আস্থা ছিল, তা পুনরায় ফিরে পাওয়ার চ্যালেঞ্জটাই এখন সবচেয়ে বড়।

২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থান বাংলাদেশের রাজনীতির ইতিহাসে এক নতুন বাঁক বদল। ৫ আগস্ট শেখ হাসিনার পতন এবং দেশত্যাগের মধ্য দিয়ে দীর্ঘ ১৭ বছরের আওয়ামী শাসনের অবসান ঘটে। আন্দোলনের মূলে থাকা ছাত্র-জনতার চাহিদার পরিপ্রেক্ষিতে ৮ আগস্ট নোবেল বিজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে গঠিত হয় অন্তর্বর্তী সরকার। এই সরকারের অংশ হন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের অন্যতম দুই মুখ নাহিদ ইসলাম ও আসিফ মাহমুদ সজিব ভূঁইয়া। পরবর্তী সময়ে এই তালিকায় যুক্ত হন আন্দোলনের আরেক মুখ মাহফুজ আলম।
তবে সরকারের বাইরে থেকে জুলাই আন্দোলনের চেতনাকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়ার লক্ষ্যে কিছু রাজনৈতিক ও সামাজিক উদ্যোগ শুরু হয়। উদ্যোগগুলো সময়ের ব্যবধানে জটিল ও বহুমুখী রূপ লাভ করে। অন্তর্বর্তী সরকার গঠনের ঠিক এক মাস পরে যাত্রা শুরু করে রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্ম জাতীয় নাগরিক কমিটি। সেখান থেকে গত দেড় বছরে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) এবং নানা বিভক্তিতে এনসিপিসহ সবমিলিয়ে অন্তত হাফ ডজন রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্মের আবির্ভাব ঘটেছে। বিশ্লেষকদের মতে, আদর্শিক দ্বন্দ্ব, নেতৃত্বের প্রতিযোগিতা এবং কৌশলগত পার্থক্যের কারণে জুলাই বিপ্লবের মূল শক্তিগুলো আজ খণ্ড-বিখণ্ড।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট শেখ হাসিনার ক্ষমতাচ্যুতির পরের মাসের ৮ সেপ্টেম্বর নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীকে আহ্বায়ক এবং আখতার হোসেনকে সদস্যসচিব করে ৫৫ সদস্যের ‘জাতীয় নাগরিক কমিটি’ ঘোষণা করা হয়। এই প্ল্যাটফর্মটি ছিল মূলত বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতাকর্মীদের নিয়ে গঠিত একটি বৃহত্তর সামাজিক উদ্যোগ। একপর্যায়ে এই কমিটি একটি পূর্ণাঙ্গ রাজনৈতিক দলে রূপ নেওয়ার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করে।

২০২৫ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) গঠিত হয়। এই নতুন দলের হাল ধরতে ২৫ ফেব্রুয়ারি অন্তর্বর্তী সরকারের তথ্য ও সম্প্রচার এবং ডাক ও টেলিযোগাযোগ উপদেষ্টার পদ থেকে পদত্যাগ করেন নাহিদ ইসলাম। দলটির প্রতিষ্ঠাকালীন আহ্বায়ক হন নাহিদ ইসলাম নিজে এবং সদস্যসচিব হন আখতার হোসেন। এনসিপি গঠনের সময় দাবি করা হয়েছিল, এটি হবে একটি অংশগ্রহণমূলক ও বৈষম্যহীন রাজনৈতিক শক্তি। তবে দল গঠনের প্রক্রিয়া শুরু হওয়ার পরপরই এর ভেতরকার অভ্যন্তরীণ কোন্দল ও আদর্শিক ফাটল প্রকাশ্যে আসতে শুরু করে।
এনসিপি গঠনের প্রক্রিয়ায় শুরুতেই ধাক্কা লাগে ইসলামী ছাত্রশিবিরের সাবেক নেতাদের সঙ্গে মতবিরোধের কারণে। জাতীয় নাগরিক কমিটিতে শিবিরের সাবেক কেন্দ্রীয় নেতাদের শক্তিশালী অবস্থান ছিল। কিন্তু যখন এই কমিটি থেকে রাজনৈতিক দল (এনসিপি) প্রতিষ্ঠা হয়, তখন তারা বিভিন্ন অভিযোগ তুলে সরে যান। তাদের প্রধান অভিযোগ ছিল সংগঠনের অর্থনৈতিক অস্বচ্ছতা এবং দলটিকে একটি সুস্পষ্ট ‘মধ্য-ডানপন্থী’ দল হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে না পারা।

এরই ধারাবাহিকতায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ইসলামী ছাত্রশিবিরের সাবেক সভাপতি আলী আহসান জুনায়েদ এবং মোহাম্মদ হিযবুল্লাহর নেতৃত্বে গঠিত হয় ‘ইউনাইটেড পিপলস বাংলাদেশ’ (আপ বাংলাদেশ)। ২০২৫ সালের ৯ মে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে এই সংগঠনের আত্মপ্রকাশ ঘটে। তবে এই ভাঙন এখানেই শেষ হয়নি। সম্প্রতি ২০২৬ সালের ৩ এপ্রিল নাঈম আহমাদকে আহ্বায়ক করে গঠিত হয়েছে জাস্টিস অ্যান্ড ডেমোক্রেসি পার্টি (জেডিপি)। নাঈম আহমাদ এর আগে ‘আপ-বাংলাদেশ’ গঠনের প্রক্রিয়ায় যুক্ত ছিলেন, অর্থাৎ এটি ভাঙনের ভেতরে আরও একটি ভাঙন।
এনসিপির ভেতরে শুধু ডানপন্থীরাই নয়, সাবেক বামপন্থী ছাত্রনেতাদের সঙ্গেও দূরত্ব তৈরি হয়। ২০২৫ সালের অক্টোবর মাসে এনসিপির যুগ্ম সদস্য সচিব মঈনুল ইসলাম তুহিন, যুগ্ম আহ্বায়ক অনিক রায় এবং কেন্দ্রীয় সদস্য অলিক মৃ পদত্যাগ করেন। তাদের অভিযোগ ছিল, এনসিপি মূলত ‘সংগঠন’ বা ‘রাজনীতি’ কোনোটিতেই সফল হতে পারছে না।

এই পদত্যাগী অংশটি এবং বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের অন্যতম সমন্বয়ক নাজিফা জান্নাতসহ ২০২৬ সালের ১৬ জানুয়ারি গঠন করেন নেটওয়ার্ক ফর পিপলস অ্যাকশন (এনপিএ)। ছাত্র ইউনিয়ন এবং এনসিপির সাবেক নেতা অনিক রায় হন এনপিএ’র কাউন্সিল সদস্য, এনসিপির সাবেক যুগ্ম সদস্য সচিব তুহিন খান হন এই প্লাটফর্মের মুখপাত্র। এছাড়া বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন এবং ছাত্র ইউনিয়নের আরেক নেত্রী নাজিফা জান্নাতও মুখপাত্র হিসেবে এই প্লাটফর্মে রয়েছেন।
জুলাই আন্দোলনের বুদ্ধিবৃত্তিক নেতা ও অন্তর্বর্তী সরকারের সাবেক উপদেষ্টা মাহফুজ আলমও এনসিপির সঙ্গে একীভূত হননি। ২০২৬ সালের ৬ মার্চ তিনি ‘অল্টারনেটিভস’ নামে একটি নতুন রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্ম ঘোষণা করেন। ১৭ সদস্যের এই ন্যাশনাল অরগানাইজিং কমিটিতে এনসিপির সাবেক কয়েকজন নেতাও যোগ দেন। মাহফুজ আলমের এই উদ্যোগটি মূলত তরুণদের রাজনীতিতে ইতিবাচক অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার লক্ষ্যে গঠিত হয়েছে বলে জানানো হয়।
অন্যদিকে, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সাবেক সদস্য সচিব এবং এনসিপির সাবেক যুগ্ম সদস্যসচিব আরিফ সোহেলও এনসিপি থেকে পদত্যাগ করে এ বছরের ১০ ফেব্রুয়ারি ‘গণবিপ্লবী উদ্যোগ’ নামে একটি প্ল্যাটফর্ম গঠন করেন। চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানের চেতনাকে ধারণ করে একটি প্রকৃত গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র গড়ার দাবি নিয়ে এই সংগঠনটি কাজ করছে।
এদিকে ২০২৪ সালের ১৩ আগস্ট গঠিত ‘ইনকিলাব মঞ্চ’ নিজস্ব ধারায় রাজনীতিতে সক্রিয় ছিল। এর প্রতিষ্ঠাতা শরীফ ওসমান বিন হাদি এক সময় নাগরিক কমিটির সদস্য ছিলেন। তবে গত ডিসেম্বরে দুর্বৃত্তের গুলিতে আহত হয়ে তাঁর মৃত্যুর পর ইনকিলাব মঞ্চের নেতৃত্বে আসেন আব্দুল্লাহ আল জাবের।
জাতীয় নাগরিক কমিটির অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা মুখপাত্র ও জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক সামান্তা শারমিন স্ট্রিমকে বলেন, ‘সবার সক্ষমতাকে একসঙ্গে ধারণে এনসিপি ব্যর্থ হয়েছে। আমরা প্রত্যেকের স্বতন্ত্র বৈচিত্র ও সক্ষমতাকে গুরুত্ব দেওয়ার রাজনৈতিক সংস্কৃতিও গড়ে তুলতে পারিনি।’
এনসিপির ভাঙনের বিষয়ে তিনি বলেন, ‘একটি দলকে ভোটে জিততে হলে অ্যাবসলিউট পাওয়ার পলিটিক্সে যুক্ত হতে হয়, যেটি এনসিপি করেছে। ফলে বুদ্ধিবৃত্তিক নীতি প্রণয়নের (পলিসি মেকিং) মতো বিষয় সেকেন্ডারি হয়ে পড়েছে। তবে যারা আলাদা হয়ে নতুন প্ল্যাটফর্ম গড়ছেন, তারা সেই শূন্যস্থান পূরণ করতে চাইছেন। তবে দলত্যাগ ও প্ল্যাটফর্মগুলোর বিভক্তির দায় আমি এবং আমার সিনিয়র নেতৃত্বকে নিতে হবে।’
একটি অভিন্ন লক্ষ্য নিয়ে শুরু হওয়া আন্দোলনে কেন এতগুলো বিভক্তি— জানতে চাইলে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, রাজনৈতিক বিশ্লেষক ড. কে এম মহিউদ্দীন বলেন, ‘এই বিভাজন মূলত নেতৃত্বের লড়াই এবং কৌশলের ভিন্নতা।’
ঢাকা স্ট্রিমকে তিনি বলেন, ‘এই যে এতগুলো প্ল্যাটফর্ম তৈরি হলো, এটি প্রমাণ করে যে তাদের মধ্যে সংহতির অভাব রয়েছে। তারা যখন সরকারে গেল কিংবা রাজনৈতিক দল গঠন করতে চাইল, তখনই তাদের জনপ্রিয়তা কমতে শুরু করে। এনসিপি বা এই ধরনের নতুন দলগুলোর সামনে নিজস্ব কোনো কংক্রিট আদর্শ নেই।’
জাসদের উদাহরণ দিয়ে তিনি বলেন, ‘জাসদ যখন ভেঙেছিল, তখন তাদের সামনে বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্রের মতো একটি আদর্শ ছিল। কিন্তু এই নতুন দলগুলোর বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠছে তারা জামায়াতের বি-টিম বা সি-টিম হিসেবে কাজ করছে। এই জনসন্দেহ তাদের ভবিষ্যৎকে অনিশ্চিত করে তুলছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘জুলাই অভ্যুত্থানের যে কাঙ্ক্ষিত ফলাফল; অর্থাৎ খুনিদের বিচার এবং টেকসই সংস্কার—তা ধীরগতিতে চলায় পাবলিক পারসেপশন এখন নেতিবাচক হয়ে পড়ছে। সাধারণ মানুষ এখন এই খণ্ড-বিখণ্ড প্ল্যাটফর্মগুলোর চেয়ে মূল সমস্যার সমাধান বেশি চাচ্ছে।’
একই বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক ড. সাব্বির আহমেদ বলেন, ‘একটি রাজনৈতিক দলের ভবিষ্যৎ নির্ভর করে তার আদর্শ এবং জনসম্পৃক্ততার ওপর। এনসিপির শুরুটা আশাব্যঞ্জক হলেও তারা সঠিক ‘কোর্স অফ অ্যাকশন’ নিতে পারেনি। যারা আন্দোলনে ছিল তারা বহু মত ও পথের মানুষ। কিন্তু কোটা সংস্কার আন্দোলনের পর তাদের মধ্যে ঐক্যের আর কোনো শক্ত ভিত্তি অবশিষ্ট থাকেনি। বাম, ডান ও মধ্যপন্থীদের এই জগাখিচুড়ি অবস্থা দলটিকে টিকিয়ে রাখতে ব্যর্থ হয়েছে।’
তিনি যোগ করেন, ‘সামান্থা শারমিন বা মাহফুজ আলম কিংবা অন্য নেতারা যখন এনসিপির সঙ্গে জামায়াতের ঘনিষ্ঠতা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন, তখন বোঝা যায় তাদের মধ্যে আদর্শিক স্পষ্টতা আছে। প্রত্যেকেই এখন জুলাইয়ের চেতনাকে নিজেদের মতো করে ব্যাখ্যা করছে এবং আলাদা আলাদা দোকান খুলছে। এতে আল্টিমেটলি জুলাই অভ্যুত্থানের মূল শক্তিই দুর্বল হয়ে পড়ছে।’
জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর নতুন বন্দোবস্তের যে আশার আলো জেগেছিল, তা এখন বহু খণ্ডে বিভক্ত। এনসিপি থেকে শুরু করে আপ-বাংলাদেশ, এনপিএ, অল্টারনেটিভস, গণবিপ্লবী উদ্যোগ কিংবা জেডিপি—সবার মুখে এক ‘জুলাইয়ের চেতনা’ থাকলেও রাজপথে তাদের সম্মিলিত উপস্থিতি নেই। বরং একে অপরের বিরুদ্ধে অভিযোগ এবং নেতৃত্বের দ্বন্দ্বে তারা এখন জনবিচ্ছিন্ন হওয়ার ঝুঁকিতে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই ছোট ছোট প্ল্যাটফর্মগুলো যদি একটি একক শক্তিশালী রাজনৈতিক কাঠামো দাঁড় করাতে না পারে, তবে ভবিষ্যতে দেশের মূল ধারার রাজনীতিতে তারা কেবল ‘চাপ সৃষ্টিকারী গোষ্ঠী’ হিসেবেই টিকে থাকতে পারে। তবে তরুণ নেতৃত্বের ওপর সাধারণ মানুষের যে এককালীন আস্থা ছিল, তা পুনরায় ফিরে পাওয়ার চ্যালেঞ্জটাই এখন সবচেয়ে বড়।

বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলের জীবন-জীবিকার সঙ্গে জড়িত তিস্তা নদীর সমন্বিত ব্যবস্থাপনা প্রকল্পে চীনের সদিচ্ছা ও অংশীদারত্ব অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে উল্লেখ করেছেন বিএনপি মহাসচিব ও স্থানীয় সরকারমন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর।
৫ ঘণ্টা আগে
জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান নিজের মুখে যে বক্তব্য দিতে পারেন না, সেই বক্তব্য রাশেদ প্রধানকে দিয়ে দেওয়ান বলে অভিযোগ তুলেছেন ছাত্রদল কেন্দ্রীয় সংসদের সাধারণ সম্পাদক নাছির উদ্দীন নাছির।
৬ ঘণ্টা আগে
জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল পরিকল্পিতভাবে শিক্ষাঙ্গনের শান্তিপূর্ণ পরিবেশ নষ্ট করার অপচেষ্টা চালাচ্ছে বলে অভিযোগ করেছেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার।
১৩ ঘণ্টা আগে
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের সংরক্ষিত নারী আসনের জন্য মনোনীত ৩৬ প্রার্থীর নাম গত সোমবার ঘোষণা করেছে ক্ষমতাসীন দল বিএনপি। তবে এই তালিকায় সরাসরি নির্বাচনের মতো সংরক্ষিত আসনেও সাংস্কৃতিক অঙ্গনের কোনো নারী শিল্পী জায়গা পাননি।
১৫ ঘণ্টা আগে