গায়ে লাগছে ৪১ ডিগ্রির বেশি, ঢাকায় এত গরম কেন

প্রকাশ : ১৮ এপ্রিল ২০২৬, ২২: ০৯
ঢাকায় এপ্রিল থেকে জুলাই পর্যন্ত তাপপ্রবাহ ঘটে বেশি। স্ট্রিম গ্রাফিক

চৈত্র পার হতেই কাঠফাটা রোদে পুড়ছে রাজধানী। ভ্যাপসা গরমে ত্রাহি দশা। আবহাওয়া সংস্থাগুলোর পূর্বাভাস, চলতি সপ্তাহে ঢাকায় তাপপ্রবাহ আসছে। ২১ এপ্রিল থেকে এই দাবদাহ মাসের শেষঅবধি চলবে। ইতোমধ্যে রাজধানীতে তার আলামত মিলছে।

ঢাকায় তাপপ্রবাহ আসছে, স্বস্তি মিলবে কবে

আবহাওয়া অধিদপ্তরের তথ্যে, বৃহস্পতিবার (১৬ এপ্রিল) দুপুর ১২টায় ঢাকার প্রকৃত তাপমাত্রা ছিল ৩৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস। অথচ আন্তর্জাতিক আবহাওয়া সংস্থা অ্যাকুওয়েদারের তথ্যে, ওইদিন ঢাকার পারদ চড়েছে ৩৪ ডিগ্রি সেলসিয়াসে। ভয়াবহ হলো– উচ্চ আর্দ্রতার কারণে ‘রিয়েল ফিল’ বা বাস্তবে এই তাপমাত্রা অনুভূত হচ্ছে ৪১ ডিগ্রি সেলসিয়াসের বেশি।

কিন্তু ঢাকায় এত গরম কেন? কেন একটু গাছের ছায়া বা শীতল বাতাস মিলছে না? এর উত্তর লুকিয়ে আছে শহরের অপরিকল্পিত কংক্রিটের জঙ্গলে, যাকে বিজ্ঞানীরা বলছেন ‘তাপীয় দ্বীপ’ বা হিট আইল্যান্ড।

তাপপ্রবাহ কী, কীভাবে ও কখন ঘটে

টানা তিন দিন বিস্তীর্ণ এলাকায় তীব্র গরম বা উচ্চ তাপমাত্রা থাকলে তাকে তাপপ্রবাহ বলে। তাপমাত্রার ওপর ভিত্তি করে একে তিন ভাগে ভাগ করেছেন আবহাওয়াবিদেরা। যেমন— ৩৬ থেকে ৩৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস ‘মৃদু’, ৩৮ থেকে ৪০ ‘মাঝারি’ এবং থার্মোমিটারের পারদ ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াস ছাড়ালে সেটি ‘তীব্র তাপপ্রবাহ’।

আবহাওয়াবিদেরা বলছেন, ঢাকায় এপ্রিল থেকে জুলাই পর্যন্ত তাপপ্রবাহ ঘটে বেশি। সেপ্টেম্বর-অক্টোবরেও কখনো কখনো দেখা মেলে। ঢাকার কিছু কিছু স্থানে তাপমাত্রা থাকে ভয়াবহ রকমের বেশি। এসব স্থানকেই ‘হিট আইল্যান্ড’ বা তাপীয় দ্বীপ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন গবেষকেরা।

ঢাকার বুকে ২৫ হিট আইল্যান্ড

রাজধানীতে দিন দিন বাড়ছে কংক্রিটের দাপট, সঙ্গে পাল্লা দিয়ে তাপমাত্রা। ২০২১ সালের সেপ্টেম্বরে বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তর, বাংলাদেশ রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটি এবং জার্মান রেড ক্রসের যৌথ গবেষণায় ঢাকার ২৫ এলাকাকে চরম উত্তপ্ত বা ‘তাপীয় দ্বীপ’ চিহ্নিত করা হয়েছে।

এই চরম উত্তপ্ত এলাকাগুলোর তালিকায় রয়েছে— বাড্ডা, গুলশান, মিরপুর, গাবতলী, কামরাঙ্গীরচর, গোরান, বাসাবো, বাবুবাজার, পোস্তগোলা, জুরাইন, হাজারীবাগ, শহীদনগর, যাত্রাবাড়ী, সায়েদাবাদ, টঙ্গী, কুর্মিটোলা, আজমপুর, উত্তরা, কামারপাড়া, মোহাম্মদিয়া হাউজিং, আদাবর, ফার্মগেট, তেজকুনিপাড়া, নাখালপাড়া ও মহাখালী। শুধু পুরোনো বা ঘিঞ্জি এলাকাই নয়; উত্তরা ও বসুন্ধরার মতো পরিকল্পিত নতুন আবাসিক প্রকল্পগুলোতেও এই তপ্ত দ্বীপের প্রভাব দেখা যাচ্ছে।

গবেষণা বলছে, ঢাকার উষ্ণতম স্থানের সঙ্গে শহরের বাইরের শীতলতম স্থানের দিন-রাতের ভূপৃষ্ঠীয় তাপমাত্রার পার্থক্য যথাক্রমে ৭ ও ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস। বিষয়টি অনেকটা এমন— ঢাকার অদূরে সাভার বা মানিকগঞ্জের সিঙ্গাইরে যখন তাপমাত্রা ৩০ ডিগ্রি সেলসিয়াস থাকছে, তখন রাজধানীর তেজগাঁও-ফার্মগেট এলাকার ভূপৃষ্ঠীয় তাপমাত্রা ৩৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস।

এমনকি ঢাকার ভেতরেও এমন পার্থক্য দেখা যায়। যেমন– দিনের সবচেয়ে উত্তপ্ত সময়ে মিরপুরের চিড়িয়াখানা ও বোটানিক্যাল গার্ডেন এলাকার তাপমাত্রা গুলশানের চেয়ে ৫ ডিগ্রি কম থাকে।

ঢাকা কেন হিট আইল্যান্ড

যুক্তরাষ্ট্রের ডেলাওয়্যার বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূগোল বিভাগ থেকে ২০২৪ সালে প্রকাশিত এক গবেষণাপত্রে ঢাকার হিট অবস্থার কারণ এসেছে। ‘বাংলাদেশের তিন শহর: ঢাকা, চট্টগ্রাম ও সিলেটে নগর তাপীয় দ্বীপের বিকাশ এবং প্রশমন ব্যবস্থা’ শীর্ষক গবেষণাটি করেছেন বাংলাদেশি গবেষক ইসরাত জাহান।

গবেষণায় দেখা যায়, দ্রুত ও অপরিকল্পিত নগরায়ণ ঢাকাকে উত্তপ্ত করে তোলার প্রধান কারণ। ২০০১ সালে ঢাকার মূল শহরের মাত্র ২১ দশমিক ৩৭ শতাংশ এলাকা ছিল ‘বিল্ট-আপ’ বা স্থাপনা, যা ২০২১ সালে দ্বিগুণের বেশি বেড়ে ৪৭ দশমিক ৪ শতাংশে দাঁড়ায়। ঢাকাকে ‘তাপীয় দ্বীপ’ হয়ে ওঠার পেছনে পাঁচটি প্রধান কারণ চিহ্নিত করা হয়েছে গবেষণায়—

১. প্রাকৃতিকভাবে শীতল থাকার উৎসগুলো ধ্বংস করে কংক্রিট, অ্যাসফল্ট ও ইটের অপরিকল্পিত ব্যবহার বেড়েছে। এগুলো দিনের বেলা সূর্যের তাপ প্রচুর পরিমাণে শোষণ করে এবং রাতে বিকিরণ করে শহরকে উত্তপ্ত রাখে।

২. বাষ্পীভবনের মাধ্যমে বাতাস শীতল রাখার অন্যতম মাধ্যম এখন প্রায় অনুপস্থিত। গত ২০ বছরে ঢাকার কৃষিজমি ৬০ শতাংশ থেকে কমে ২২ শতাংশে নেমেছে।

৩. শহরের সুউচ্চ ভবন ও সরু গলিগুলো বাতাসের স্বাভাবিক প্রবাহকে বাধাগ্রস্ত করছে। ফলে আটকে থাকা তাপ বের হওয়ার সুযোগ পাচ্ছে না।

৪. যানবাহন, শিল্পকারখানা এবং শীততাপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্রের (এসি) ব্যাপক ব্যবহার থেকে নির্গত গরম বাতাস সরাসরি শহরের তাপমাত্রা বাড়িয়ে দিচ্ছে।

৫. ঢাকার মতো ক্রান্তীয় অঞ্চলে উচ্চ তাপমাত্রা ও আর্দ্রতার সংমিশ্রণ জনজীবনকে দুর্বিষহ করে তুলছে। বাতাসে আর্দ্রতা বেশি থাকায় ঘামের মাধ্যমে শরীরের তাপ বের হতে পারে না। ফলে প্রকৃত তাপমাত্রার চেয়ে অস্বস্তি কয়েক গুণ বেড়ে যায় (যেমন– প্রকৃত ৩৪ ডিগ্রি অনুভূত হয়েছে ৪১)।

বহুমুখী ক্ষয়ক্ষতি ও ভবিষ্যৎ শঙ্কা

এই ক্রমবর্ধমান তাপমাত্রা কেবল অস্বস্তিই বাড়াচ্ছে না, বরং ডেকে আনছে বহুমুখী বিপদ। ইসরাত জাহানের গবেষণায় বলা হয়েছে, তীব্র গরমের কারণে নগরবাসীর মধ্যে হিটস্ট্রোক, পানিশূন্যতা এবং চরম অবসাদের মতো স্বাস্থ্যঝুঁকি উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে। তাপমাত্রা বৃদ্ধির কারণে ডেঙ্গু, ম্যালেরিয়া ও কলেরার মতো রোগের প্রাদুর্ভাব ভবিষ্যতে আরও ভয়াবহ আকার ধারণ করতে পারে।

ঘরবাড়ি শীতল রাখতে ফ্যান ও এসির ব্যবহার বহুগুণ বেড়ে যাওয়ায় বিদ্যুতের চাহিদা ও খরচ বাড়ছে, যা নিম্ন আয়ের মানুষের ওপর বাড়তি অর্থনৈতিক চাপ তৈরি করছে। রোদে কাজ করা শ্রমজীবী মানুষের কর্মক্ষমতা মারাত্মকভাবে কমে যাওয়ায় এর বিরূপ প্রভাব পড়ছে সামগ্রিক অর্থনীতিতে।

সবচেয়ে শঙ্কার, এই অস্বাভাবিক তাপমাত্রার কারণে স্থানীয় জীববৈচিত্র্য ধ্বংস হচ্ছে। এখনই কার্যকর ব্যবস্থা না নিলে ২০৫০ সাল নাগাদ ঢাকার গড় তাপমাত্রা আরও দেড় থেকে ২ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত বেড়ে যেতে পারে।

বাঁচার উপায়

ঢাকার এই ভয়াবহ উত্তাপ সামাল দিতে গবেষণাপত্রে বেশ কিছু জরুরি ও দীর্ঘমেয়াদি সুপারিশ করা হয়েছে।

ব্যাপক সবুজায়ন: শহরের খালি জায়গা ও রাস্তার পাশে পরিকল্পিত বনায়নের পাশাপাশি বাসাবাড়িতে ছাদবাগান বাধ্যতামূলক করতে হবে। রাজউকের নিয়মানুযায়ী ছাদবাগান করলে ১০ শতাংশ হোল্ডিং ট্যাক্স ছাড়ের সুবিধাটির ব্যাপক প্রচার ও প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। নতুন ভবনে ‘গ্রিন প্লট রেশিও’ নীতি কঠোরভাবে মানতে হবে।

জলাধার উদ্ধার: প্রাকৃতিকভাবে শহর শীতল রাখতে হাতিরঝিলের মতো প্রকল্প গ্রহণ এবং শহরের ভেতর দিয়ে বয়ে চলা মৃত খাল ও পুকুরগুলো উদ্ধার করতে হবে।

‘কুল রুফ’ প্রযুক্তি: ভবনের ছাদ ও রাস্তায় গাঢ় রঙের বদলে উজ্জ্বল বা তাপ প্রতিফলক উপকরণ ব্যবহার করতে হবে, যা সূর্যের আলো শোষণ না করে সহজেই প্রতিফলিত করে দেয়।

গ্রিন নেটওয়ার্ক: রমনা পার্ক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এবং ধানমন্ডি লেকের মতো সবুজ এলাকা ও জলাভূমিগুলোকে যুক্ত করে একটি ‘গ্রিন নেটওয়ার্ক’ তৈরি করতে হবে, যা শহরে বাতাসের স্বাভাবিক প্রবাহ বাড়াবে।

গবেষণায় মনে করিয়ে দেওয়া হয়েছে, কেবল সরকারি উদ্যোগে এই সংকট মোকাবিলা সম্ভব নয়; সাধারণ মানুষকেও স্বতঃস্ফূর্তভাবে বৃক্ষরোপণে এগিয়ে আসতে হবে। পাশাপাশি জ্বালানি সাশ্রয়ে সচেতন হতে হবে। তা না হলে ভবিষ্যতের ঢাকা তপ্ত উনুনে পরিণত হতে পারে।

সম্পর্কিত